মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাযি


গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েই অসংখ্য প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। প্রথম নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল অঘোষিত সামরিক সরকারের অধীনে। আর পরের দুটি দলীয় সরকারের অধীনে। বাংলাদেশের সবগুলো নির্বাচন নিয়ে কিছু না কিছু বিতর্ক থাকলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনই ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং ক্ষমতার পালাবদলও হয়েছে প্রতিবার। দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে ক্ষমতার পরিবর্তন এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে হয়নি। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি একটি যৌক্তিক দাবি। অন্তত যতদিন না এদেশে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ হয়।

দ্বিতীয়তঃ যারা সরকারে থাকে, সাধারণত তাদের সমর্থন হ্রাস পায়। কারণ, মানুষের চাহিদার তুলনায় যোগান কম। তাই মানুষ না পাওয়ার ব্যথা থেকে কোন না কোনভাবে সরকারের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা মনে করে- নতুন সরকার আসলে হয়তো এর প্রতিকার হবে। তাছাড়া চলমান জুলুম-নির্যাতন, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়ভার সরকারের ঘাড়েই বর্তায়। ফলে মানুষ বিকল্প পথ খোঁজে।

আর যদি সে দল নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে উপর্যুপরি ক্ষমতায় বসে কিংবা তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, খুন, ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ-এর মত অভিযোগ থাকে, এতে তার নৈতিক ভিত্তি বেশ দুর্বল হয় এবং আন্তর্জাতিকভাবেও সে সমর্থন হারিয়ে ফেলে।

এতদসত্ত্বেও যে বিরোধী দল এমন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করতে না পারে, সে বিরোধীদলের হয়তো জনসমর্থন নেই; নয়তোবা তাদের নেতৃত্বে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে বলেই প্রমাণিত হবে।

বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলোর জনসমর্থন নেই, এ কথা বলার সুযোগ নেই। কেননা, একাধিক কর্মসূচি ও জরিপে প্রমাণিত যে, বিরোধী দলগুলোর পক্ষে জোরালো ও ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা হচ্ছে নেতৃত্বে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নেতৃত্ব সংকট কাটাতে শরণাপন্ন হয়েছে প্রবীণ এক বামপন্থী নেতৃত্বের। যারা সাধারণত বিশ পঁচিশ জন নিয়ে সভা সমাবেশ করে অভ্যস্ত। এদেশের গণমানুষের সঙ্গে মূলত তাদের কোন সম্পৃক্ততা নেই। কারণ, তারা এ মাটির চাহিদা ও মেজাজ বুঝতে অক্ষম। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যা চায়, তারা বরাবরই সে চাওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে থাকে। ফলে কখনোই ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখতে পারেন না তারা।

এমন নেতৃত্বে বিরোধী জোট কখনোই সফল হবে না এ কথা পূর্বেই অনুমান করা গিয়েছিল। যদিও দিশেহারা জাতি আশায় বুক বেঁধে ছিল একটা পরিবর্তন আসবে বলে। কিন্তু আসেনি সেই কাঙ্খিত পরিবর্তন। এর জন্য সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারাকেই দায়ী করা যায়। অবশ্য এখন একথা সবাই বুঝতে পারছে যে, বামপন্থী নেতৃত্ব হায়ার করা আসলে বিরোধী জোটের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা বামপন্থীদের কারণেই সম্ভব হয়েছিল। এবং এই বামপন্থীরাই কৌশলে গোপন আঁতাতের ভিত্তিতে সর্বশেষ নির্বাচনে জনগণকে চূড়ান্তভাবে হতাশ করেছে।

তাইতো আমরা দেখেছি, একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের পরেও এখন পর্যন্ত বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে জোরালো কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়নি। কেমন যেন বৃহত্তম বিরোধী জোট এখন বামপন্থীদের মত টেবিল টক ও মিডিয়া আপডেট দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চায়।

তাছাড়া নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, কেমন নির্বাচন করতে চায় সরকার। তারপরেও দলীয় কিছু লোকের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে নির্বাচনে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাওয়া কতটা আত্মঘাতী ছিল, এ কথা বুঝতে এখন আর কারো সমস্যা হচ্ছে না। সঠিক ও মজবুত নেতৃত্ব হলে যখন নির্বাচনের মাঠ থেকে সংসদ সদস্য প্রার্থীদেরকে মেরে ধরে বিদায় করে দেয়া হচ্ছিল, তখনই কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারত। এ ব্যর্থতা নেতৃত্বের। যদিও তারা ভালো থাকবেন আর এর প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করবেন জনগণ!

বিরোধী জোটের বড় ব্যর্থতা ছিল- তারা তাদের কর্মী-সমর্থকদেরকে মাঠে নামাতে পারে নি। ভোটযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করতে পারেনি। পক্ষান্তরে সরকারি দল নানা উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে হলেও তার দলের কর্মী সমর্থক ও ক্যাডার বাহিনীকে সঙ্ঘবদ্ধ ও সক্রিয় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বলা হবে সরকারের জুলুম-নির্যাতনের মোকাবেলায় দাঁড়াতে পারবে কীভাবে? সব সরকারই কমবেশি জুলুম নির্যাতন করে থাকে। যদি সামান্য ত্যাগ স্বীকার করে সেই সরকারের জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো না যায়, তাহলে কোন দিনই হয়তো জনগণের মুক্তি মিলবে না। তাই জুলুম-নির্যাতনের খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে মাঠ ছেড়ে দেয়া কখনোই রাজনৈতিক দলের কর্মী কিংবা নেতার কাজ হতে পারে না।

কেউ মনে করতে পারে, হেফাজত যদি আমাদের সঙ্গে সক্রিয় থাকতো তাহলে আমরা সফল হতাম। হেফাজত কেন আপনাদের সঙ্গে থাকবে? হেফাজত তো কোন রাজনৈতিক দল নয় যে, রাজনৈতিক আন্দোলনে কারো সঙ্গে থাকবে। এছাড়া হেফাজতের কোন দাবি রাজনৈতিক ছিল না। এখন যদি আপনারা মনে করেন রাজনৈতিক ইস্যুতে হেফাজত আপনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে, এটা আপনাদের অন্ধত্ব, যা স্বার্থপরতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। তবে দেশে যতোগুলো ইসলামী রাজনৈতিক দল সক্রিয় রাজনীতি করছে তারা তো আপনাদের সঙ্গে আছে এবং নীতিগতভাবেও হেফাজত সমর্থকদের প্রায় বড় অংশ আপনাদের সঙ্গে। কিন্তু এর মানে ওনারা দায়িত্ব নিয়ে আপনাদেরকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিবে না। আপনাদেরকে দায়িত্ব নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আপনারা সামনে এগিয়ে যেতে পারেননি, ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। এখন এর দায়ভার হেফাজত কিংবা আল্লামা আহমদ শফীর কাঁধে কেন চাপিয়ে দিচ্ছেন?

সরকার কওমি মাদ্রাসার সনদের মান প্রদান করেছে, কওমি মাদ্রাসাগুলোর পক্ষ থেকে সরকারকে শুকরিয়া মাহফিল করে শুকরিয়া জ্ঞাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার রাজনৈতিকভাবে উপকৃত হয়েছে, এটা সরকারের কৌশলগত সফলতা । এ প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ সরকার থেকে উপকৃত হবার চেষ্টা করেছে, এটাও তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার ছিল। কওমি শিক্ষা বোর্ড বা হেফাজত বা আহমদ শফীর সঙ্গে এর কোন ধরনের সম্পৃক্ততা নেই।

হ্যাঁ, কৌশলে সরকার শাপলা চত্বরের রক্তের দাগ মুছে দিতে চেয়েছিল এই শুকরিয়া সমাবেশের মাধ্যমে, তাও ঠিক। হেফাজতে ইসলাম তার ১৩ দফা দাবি নিয়ে মাঠে সক্রিয় থাকতে পারেনি, এ যে হেফাজতের দুর্বলতা তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে শাপলা চত্বরে ক্র্যাকডাউনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ১৩ দফার কাজ চালিয়ে যাওয়া কতটা কঠিন ছিল, এও কারো অজানা নয়।

আল্লামা আহমদ শফী বয়োবৃদ্ধ একজন মানুষ। তিনি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন, স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কথা বলেন। ফলে কখনো কখনো তার কথার ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। তিনি যখন কোন কথার ব্যাখ্যা দিয়ে দেন তখন তার পূর্বের বক্তব্যের খণ্ডাংশ সামনে এনে মন্তব্য করা, বিবৃতি দেয়া জঘন্যতম অপরাধ। আর যদি কারো তার ব্যাখ্যার উপর আপত্তি থাকে তাহলে বুঝতে হবে আল্লামা আহমদ শফীর চেতনা ও বিশ্বাসের সঙ্গে তার চেতনা ও বিশ্বাসের কোন মিল নেই। এখন সেই চেতনা বিশ্বাসের জায়গা টুকু যদি হয় ইসলামের পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক, তাহলে যারা এই চেতনা বা বিশ্বাসের বিরোধিতা করবে আর যাই হোক তাদেরকে মুসলমান হিসেবে গণনা করা যাবে না।

সর্বশেষ, আহমদ শফী সাহেব কী বলেছেন সেদিন? তিনি নারীদের পর্দার কথা বলেছেন, নারী নিরাপত্তার কথা বলেছেন। তিনি পর্দাহীনতার কারণে অনিরাপদ নারীকে স্কুল কলেজে পাঠাতে নিষেধ করেছেন। এখানে তার অন্যায়টা কোথায়? তিনি তো ইসলামের বিধানকেই ব্যাখ্যা করেছেন। তাহলে যারা ইসলামের বিধানকে অস্বীকার করছে, তাদের সঙ্গে দেশের ধর্মীয় জনগণের কি করে সম্পর্ক থাকতে পারে কিংবা তারা কি করে মানুষের সমর্থন আশা করতে পারে? হয়তো একদিন তাই হবে। ড. কামাল এবং মিস্টার ফখরুলরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে দেউলিয়া হয়ে পড়বে।