Monthly Archives: এপ্রিল ২০২০

করোনার পরিস্থিতিতে দেওবন্দের ফাতওয়ার আলোকে মসজিদে ও ঘরে জুমু‘আ আদায়ের সমাধান

করোনার পরিস্থিতিতে জুমু‘আ আদায়ে দারুল উলূম দেওবন্দের
পরিবর্তিত তাফসিলী ফাতওয়ার আলোকে মাসআলার সমাধান

—————————————————————-
মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী
—————————————————————-

ইতোপূর্বে দেওবন্দের ‍মুহতামিম মুফতী আবুল কাসিম নুমানী সাহেবের পক্ষ থেকে করোনা ভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতিতে যে ফাতওয়া প্রকাশিত হয়েছে, মুফতীয়ানে দেওবন্দের ঐক্যবদ্ধ ফাতওয়ায় সে ব্যাপারে কিছু পরিবর্তন বা সংশোধনী আনা হয়েছে। সেই আলোকে দারুল উলূম দেওবন্দের মুফতীয়ানে কিরামের ৬ শা‘বান-১৪৪১ হিজরী প্রকাশিত তাফসিলী ফাতওয়ার ভিত্তিতে এ পরিস্থিতিতে মসজিদসমূহে ও ঘরে জুমু‘আর নামায আদায়ের বিষয়ে নিম্নবর্ণিত সমাধান পেশ করা হচ্ছে–

……………………………………………………………………………………………………………………..

দেওবন্দের ফাতওয়ার ‍মূল কপি ….

……………………………………………………………………………………………………………………..

.

মাসআলা–১

➊ যে শহর বা উপশহর কিংবা বড় গ্রামে জুমু‘আ সহীহ হওয়ার শর্ত পাওয়া যায় এবং সেই ভিত্তিতে সেখানে পূর্ব থেকেই যে সকল মসজিদে জুমু‘আর নামায কায়েম হয়ে আসছে, সেখানে সরকারের বেঁধে দেয়া নিয়ম অনুযায়ী, অনুর্দ্ধ ১০ জন লোক যথারীতি জুমু‘আর নামায আদায় করবেন।

.

মাসআলা–২

➋ যে শহর বা উপশহর কিংবা বড় গ্রামে জুমু‘আ সহীহ হওয়ার শর্ত পাওয়া যায়, সেখানে যদি কোন পাঞ্জেগানা মসজিদ থাকে–যেখানে পূর্বে জুমু‘আ পড়া হতো না, বর্তমান অবস্থায় পরিস্থিতি ‍স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সেই এলাকার পাঞ্জেগানা ওয়াক্তী মসজিদে অনুর্দ্ধ ১০জন মুসল্লী নিয়ে জুমু‘আর নামায কায়েম করবেন। তাহলে এর দ্বারা আরো কিছু মুসল্লীর জুমু‘আর নামায আদায়ের সুযোগ হবে।

.

……………………………………………………………………..

উল্লিখিত পরিস্থিতিতে ইযনে ‘আম সম্পর্কে সন্দেহের নিরসন :
……………………………………………………………………..

 

বর্তমান উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মসজিদে ১০জন মুসল্লীর অতিরিক্ত কাউকে মসজিদে ঢুকতে না দেয়ার কারণে ইযনে ‘আম-এর মধ্যে সমস্যা হবে না। কেননা, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মসজিদসমূহের মধ্যে জুমু‘আর নামাযে ১০জন মুসল্লীর বেশী কাউকে মসজিদে ঢুকতে যে নিষেধ করা হচ্ছে, এটা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জনস্বার্থে নেয়া সরকারী পদক্ষেপ হিসেবে করা হচ্ছে। তাই এটা জুমু‘আ সহীহ হওয়ার জন্য ইজনে ‘আম শর্তের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত হবে না। কারণ, এর ‍উদ্দেশ্য মানুষকে জুমু‘আ থেকে বাধা দেয়া নয়, বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে– নিয়ম ভঙ্গের ফলে আরোপিত অসুবিধা থেকে রক্ষা পাওয়া।

এ সম্পর্কে ফাতওয়ার কিতাবে বলা হয়েছে–
اما اذا كان لمنع عدو يخشي دخوله وهو في الصلاة فالظاهر وجوب الغلق –
“কিন্তু যদি জুমু‘আর নামাযে আসতে বাধা দেয়া কোন শত্রুর কারণে হয়–নামায পড়া অবস্থায় যার প্রবেশের আশংকা হয়, তখন অনায়াসেই গেট লক করার হুকুম দেয়া আবশ্যক হবে।”

(দ্রষ্টব্য : হালাবী [হাশিয়াতুত তাহতাভী আলাদ দুররিল মুখতার, ১ম খণ্ড, ৩৪৪ পৃষ্ঠা])

তেমনি অপর কিতাবে এ সংক্রান্ত ফাতওয়ার ব্যাখ্যায় রয়েছে–
قوله ”لم تنعقد“ يحمل علي ما اذا منع الناس لا ما اذا كان لمنع عدو او لقديم عادة وقد مر
“তার কথা : ‘ইযনে ‘আম না থাকলে জুমু‘আ সহীহ হবে না’ এটা ঐ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যখন মানুষকে জুমু‘আয় শরীক হতে বাধা দেয়া হবে। কিন্তু যদি শত্রুকে বাধাগ্রস্ত করতে অথবা সেখানকার নিরাপত্তার পূর্বনিয়ম হিসেবে সেখানে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়, তা জুমু‘আ কায়েমে প্রতিবন্ধক হবে না। এ সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।”

(দ্রষ্টব্য : হালাবী [হাশিয়াহ : আত-তাহতাবী আলাদ দুররিল মুখতার, ১ম খণ্ড, ৩৪৪ পৃষ্ঠা])

অনুরূপভাবে ইমদাদুল ফাতাওয়া কিতাবে রয়েছে–
اذن عام ہونا بهي منجمله شرائط صحت جمعه ہے – جس کے معني یہ ہیں کہ خود نماز پڑھنے والے كو روكنا وہان مقصود نہ ہو – باقي اگر روک ٹوک كسي اور ضرورت سے ہو وه اذن عام مين مخل نہیں –
“ইযনে ‘আম বিদ্যমান থাকাও জুুমু‘আ সহীহ হওয়ার শর্তাবলির অন্তর্ভুক্ত। যার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো–স্বয়ং নামায আদায়কারীগণকে যেন বাধা দেয়া সেখানে উদ্দেশ্য না হয়। তবে যদি অন্য কোন প্রয়োজনে বাধা দেয়া হয়, তা ইযনে আম-এর মধ্যে বিঘ্নতা সৃষ্টিকারী গণ্য হবে না।”

(দ্রষ্টব্য : ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১ম খণ্ড, ২১৪ পৃষ্ঠা])

তেমনি ইমদাদুল আহকাম কিতাবে বলা হয়েছে–
اگر چھاؤنی يا قلعہ ميں جمعہ ادا كيا جائے تو جائز ہے – گو چھاؤنی اور قلعہ ميں دوسرے لوگ نہ آ سكتے ہو – كيوں کہ مقصود نماز سے روكنا نہیں ہے , بلكه انتظام مقصود ہے –
“যদি সেনা ছাউনি বা কিল্লার মধ্যে জুমু‘আ আদায় করা হয়, তাহলে তা জায়িয হবে। যদিও সেনা ছাউনি ও কিল্লায় অন্য লোকজন আসতে পারেন না। কেননা, সেখানে তাদেরকে প্রবেশ করতে না দেয়া নামায থেকে বাধা দেয়ার জন্য নয়, বরং তাতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা উদ্দেশ্য।”

(দ্রষ্টব্য : ইমদাদুল আহকাম, ১ম খণ্ড, ৭৫২ পৃষ্ঠা)
.
—————————————————————

.

মাসআলা–৩

➌ শহর বা উপশহর কিংবা বড় গ্রাম-এলাকার যে সকল লোক মসজিদে জুমু‘আ আদায় করতে না পারেন, তাদের নিজেদের বাড়ীর বৈঠকখানায় বা ড্রইংরুমে যদি নামাযের ব্যবস্থা করা যায়, আর সেই এলাকার পরিস্থিতি যদি বেশী নাজুক না হয় অর্থাৎ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকজনের একত্রিত হতে বাধা না থাকে, সেই সাথে ইযনে ‘আম-এর সাথে জুমু‘আর ইন্তিজাম করা সম্ভব হয় অর্থাৎ আশপাশের লোকজনকে জুমু‘আর জন্য জানানো হয় যে, যারা ইচ্ছুক তারা শরীক হতে পারেন, এরপর সরকারী নিয়ম হিসেবে জুমু‘আর জন্য সর্বসাকুল্যে অনুর্দ্ধ ১০ জনকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়, সেই অবস্থায় তারা মিলে সেখানে জুমু‘আর নামায আদায় করে নিবেন।

স্মার্তব্য যে, যে সকল অবস্থায় ‍জুমু‘আর নামায পড়ার কথা বলা হয়েছে, সেক্ষেত্রে জুমু‘আর জন্য ইমাম সাহেব ছাড়াও আরো অন্তত তিনজন মুসল্লী থাকা আবশ্যক। কিন্তু যদি মুসল্লী এর চেয়ে কম হয়, তাহলে জুমু‘আ পড়া সহীহ হবে না। তখন ইনফিরাদীভাবে জোহরের নামায পড়ে নিতে হবে।

.

মাসআলা–৪

➍ যারা উল্লিখিত অবস্থায় সেভাবে (ইযনে ‘আম-এর সাথে বৈঠকখানায়) জুমু‘আ কায়েম করতে না পারেন প্রশাসনের বাধার কারণে কিংবা পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ায় লোকজনের একত্র হওয়া সম্ভব না হওয়ার কারণে অথবা পরিস্থিতির ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে কেউ জুমু‘আর জন্য যেতে পারছেন না, অথবা ইমাম ব্যতীত আরো তিনজন ‍মুসল্লী না থাকায়, কিংবা যারা আছেন, তাদের মধ্যে কেউ ইমাম হয়ে খুৎবাহ-নামায ইত্যাদি সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা না থাকার কারণে, এমতাবস্থায় তারা শরীয়তের দৃষ্টিতে মা‘জূর বলে গণ্য হবেন। তাই তাদের জন্য যার যার ঘরে ইনফিরাদীভাবে (জামা‘আত না করে) জোহরের নামায পড়া কর্তব্য হবে।

উল্লেখ্য, সেই অবস্থায় তারা (জুুমু‘আর পরিবর্তে) জোহরের নামায জামা‘আতের সাথে আদায় করতে পারবেন না। অন্যথায় তা মাকরূহ হবে। কেননা, শহর বা উপশহর কিংবা বড় গ্রাম-এলাকায় যেখানে জুুমু‘আ ফরজ, সেখানে যখন জুমু‘আর ব্যবস্থা থাকবে তা এক স্থানে হোক বা কয়েক স্থানে এবং তার ছোট জামা‘আত হোক বা বড় জামা‘আত, কোন অবস্থায়ই সেখানে কোন ‍উজরের কারণে যারা জুমু‘আর নামায পড়তে পারেননি, তাদের জন্য জোহরের নামায জামা‘আতে পড়া মাকরূহে তাহরীমী হবে। এটাই সঠিক দলীলভিত্তিক ফাতওয়া। এমতাবস্থায় যারা জামা‘আতের সাথে জোহরের নামায পড়ার অবকাশের কথা বলেন, তাদের কথা জুমহুরের মতের খিলাফ। এ সম্পর্কে ফাতওয়ার কিতাবে রয়েছে–
قوله ”وصورة المعارضة“ لان شعار المسلمين في هذا اليوم صلاة الجمعة – وقصد المعارضة لهم يؤدي الي امر عظيم – فكان في صورتها كراهة التحريم –
“তার বক্তব্য : ‘তখন জোহরের জামা‘আত দ্বারা জুুমু‘আর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সূরত হয়, যা মাকরূহ।’ কেননা, জুমু‘আর দিন ‍মুসলমানদের নিদর্শন হচ্ছে জুমু‘আর নামায। আর এ সময় তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাই তখন জোহরের জামা‘আতের ব্যবস্থা মাকরূহে তাহরীমী হবে।”

(দ্রষ্টব্য : রদ্দুল মুহতার-কিতাবুস সালাহ-বাবুল জুমু‘আ, ৩য় খণ্ড, ৩৩ পৃষ্ঠা)

তেমনি ইমাম সারাখসীর আল-মাবসূত কিতাবে বলা হয়েছে–
لان المأمور به في حق من يسكن المصر في هذا الوقت شيئان ترك الجماعة و شهود الجمعة واصحاب السجن قدروا علي احدهما وهو ترك الجماعة فيأتون بذلك –
“জুমু‘আর দিন কয়েদীগণ জুমু‘আ পড়তে না পারলে একাকিভাবে জোহর পড়বেন (জামা‘আত করে নয়)। কেননা, এ সময় যারা শহরে বাস করছেন, তাদের ক্ষেত্রে (অবস্থাভেদে) দু’টি হুকুমের কোন একটি প্রযোজ্য হবে : (ক) (উজরের কারণে) জামা‘আত তরক করা। (খ) জুমু‘আর নামাযে উপস্থিত হওয়া। আর কয়েদীগণ এতদুভয়ের একটি করতে সক্ষম হচ্ছেন, তা হলো জামা‘আত তরক করা। সুতরাং তারা সেটাই করবেন।”

(দ্রষ্টব্য : আল-মাবসূত লিস-সারাখসী, বাবু সালাতিল জুমু‘আহ, ২য় খণ্ড, ৩৯ পৃষ্ঠা)

.

মাসআলা–৫

➎ যে ছোট গ্রামে জুুমু‘আ আদায়ের শর্ত পাওয়া যায় না, সেখানকার বাসিন্দাগণ অনান্য দিনের মতো জুমু‘আর দিনেও মসজিদে (অনুর্দ্ধ ৫জন) অথবা নিজেদের ঘরে ৫জন মিলে জোহরের নামায জামা‘আতের সাথে আদায় করবেন। তাদের জন্য জোহরের নামায একাকি পড়ার আবশ্যকতা নেই। এ সম্পর্কে ফাতওয়ার কিতাবে রয়েছে–
ومن لم تجب عليهم الجمعة من اهل القري والبوادي لهم ان يصلوا الظهر بجماعة يوم الجمعة باذان واقامة –
“আর ছোট গ্রাম বা উপত্যকার অধিবাসীগণ যাদের উপর জুমু‘আ ফরজ নয়, তাদের জন্য জুমু‘আর দিন আযান ও ইকামতের সাথে জোহরের নামায জামা‘আত করে আদায় করা সঙ্গত হবে।”

(দ্রষ্টব্য : ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ‘আলা হামিশিল হিনদিয়্যাহ, ১ম খণ্ড, ১৭৭ পৃষ্ঠা)

তেমনি অপর কিতাবে রয়েছে–
وقوله ”في مصر“ اما في حق اهل السواد فغير مكروه لانه لا جمعة عليهم –
“তার বর্ণনা : ‘শহরের মধ্যে জুমু‘আর দিন জোহরের নামায জামা‘আতে পড়া মাকরূহ।’ কিন্তু ছোটগ্রামের অধিবাসীগণের জন্য তা মাকরূহ নয়। কেননা, তাদের উপর ‍জুমু‘আ নেই।”

(দ্রষ্টব্য : হাশিয়াতুত তাহতাভী ‘আলাদ দুররিল মুখতার, ১ম খণ্ড,৩৪৬ পৃষ্ঠা)

এভাবে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সকলে নিজ নিজ অবস্থা অনুযায়ী মাসআলা নির্ণয় করে আমল করবেন। এ জন্য প্রয়োজনে স্থানীয় আলেম-মুফতীগণ থেকে পরামর্শ নিতে পরেন। মহান আল্লাহ সকলকে সহীহভাবে দ্বীনের সকল আমল যথাযথভাবে পালন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

Tagged ,

বাইরের মুসল্লীগণ মসজিদে জামা‘আতে অংশ নিতে পারবেন না : ধর্ম মন্ত্রণালয়

করোনার দুর্যোগে ঘরে নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছে ধর্মমন্ত্রণালয়

এখন থেকে মুসল্লীদের ঘরে নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক জরুরী বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শুধু মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমগণ মসজিদে নামায আদায় করবেন। বাইরের মুসল্লীগণ কেউ মসজিদে জামা‘আতে অংশ নিতে পারবেন না। কেউ এই নির্দেশ অমান্য করে মসজিদে ভিড় করলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবস্থা নেবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সাখাওয়াৎ হোসেন-এর সই করা এক জরুরী বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, ভয়ানক করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে মসজিদের ক্ষেত্রে খতীব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমগণ ছাড়া অন্য সব মুসল্লীগণ নিজ নিজ বাসায় নামায আদায় করবেন। মসজিদে গিয়ে জুমু‘আর নামাযের জামা‘আতে অংশগ্রহণের পরিবর্তে সকল যার যার ঘরে জোহরের নামায আদায় করবেন। এটা সরকারের নির্দেশ।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মসজিদে জামা‘আত চালু রাখার প্রয়োজনে খতীব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমগণ মিলে পাঁচওয়াক্তের নামায অনধিক পাঁচজন এবং জুমু‘আর জামা‘আতে অনধিক ১০ জন শরীক হতে পারবেন। বাইরের মুসল্লী মসজিদে জামা‘আতে অংশ নিতে পারবেন না। এই নির্দেশ কেউ অমান্য করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিষয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, করোনা-ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সবাই কঠোরভাবে এই নির্দেশনা মানবেন বলে তিনি মনে করেন। অন্যথায় শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

এ নির্দেশনা অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে বলে জানানো হয়।

Tagged

অবশেষে বন্ধ হলো যাত্রীদের জন্য ফেরি চলাচল

করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যাত্রীদের জন্য ফেরি চলাচল বন্ধ

 

আজ ৫ এপ্রিল রোববার সকাল থেকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিতে যাত্রী পারাপার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর আগে গতকাল ৪ এপ্রিল রাত সাড়ে ১১টার দিকে বন্ধ করে দেয়া হয় কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌরুটে ফেরিতে যাত্রী পারাপার।

মাদারীপুর জেলাপ্রশাসনের পক্ষ থেকে কাঁঠালবাড়ি ও মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যাত্রী পারপার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান খাজা মিয়া বলেন, ফেরি চলাচল করবে, কিন্তু তাতে যাত্রী পারাপার করা হবে না। শুধুমাত্র পণ্যবাহী গাড়ী ও অ্যাম্বুলেন্স পারাপার করা হবে। আর স্থানীয় পুলিশ ও জেলাপ্রশাসন এ ব্যাপারে সহযোগিতা করবে।

তিনি বলেন, ৪ ফেব্রয়ারী গার্মেন্টস-এর হাজার হাজার মানুষ ফেরিতে গাদাগাদি করে রাজধানী ঢাকার দিকে যাত্রা করেন। এতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই এ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছেন।

মানিকগঞ্জ ও মাদারিপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদারকি করার জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। করপোরেশনটির চেয়ারম্যান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যরাও এ ব্যাপারে সহযোগিতা থাকবেন।

Tagged

অবশেষে পুরোপুরি লকডাউন ঢাকা

ঢাকায় ঢোকা এবং ঢাকা থেকে বের হওয়া বন্ধ

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এড়াতে ঢাকা থেকে যাতে কোনো লোক বাইরে যেতে না পারে এবং ঢাকার বাইরে থেকে কোনো মানুষ যাতে ঢাকায় আসতে না পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশের সব ইউনিটকে নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী।

আজ ৫ এপ্রিল রোববার তিনি এই নির্দেশনা দেন। আইজিপির এই নির্দেশে ঢাকা লকডাউনের কথা উল্লেখ না করা হলেও কার্যত ‘লকডাউন’ হলো ঢাকা।

এ অবস্থায় কেবল স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জরুরি পরিষেবার কাজে নিয়োজিতরা ঢাকায় ঢুকতে এবং বের হতে পারবেন বলে নির্দেশনা দেয়া হয়।

পুলিশ সদর দফতর আইজিপির এই নির্দেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সদর দফতর জানায়, বাংলাদেশ পুলিশ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ও সবাইকে ঘরে রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ যাতে বাইরে বের না হয় সেজন্য কাজ করছে। তাই জরুরি প্রয়োজন ছাড়া পুলিশ কাউকে ঢাকার বাইরে যেতে দেবে না।

Tagged ,

মসজিদসমূহের ব্যাপারে এ মুহূর্তে করণীয় || ধর্মমন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের প্রতি আহবান

বর্তমান উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে মসজিদসমূহের জন্য করণীয়

——————————————————
মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী
——————————————————
.

শবে বারাআত নিকটবর্তী। দেশের মানুষের যে মানসিক অবস্থা, তাতে বলা যায়, শবে বারাআতে মসজিদসমূহে মুসল্লীর ঢল নামবে। তাতে লকডাউন চরমভাবে উপেক্ষিত হবে। যার ফলাফল সর্বজন বিদিত।

করোনা ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য হলো–প্রাথমিক দিনগুলোতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে, কিন্তু পরবর্তীতে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সেই কথা চিন্তা করে দেশের বর্তমান সময়টা নিয়ে পর্যবেক্ষক মহল উদ্বিগ্নতায় রয়েছেন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমগণ ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের বৈঠকে বর্তমান অবস্থায় মসজিদে নামাযের ব্যাপারে দু’টি সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন–

(১) মসজিদ বন্ধ করা যাবে না।

(২) সীমিত মুসল্লী দিয়ে মসজিদসমূহে নামাযের ব্যবস্থা করতে হবে।

সেই আলোকে ধর্মমন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউণ্ডেশন এ মুহূর্তে ঘোষণা দিতে পারে যে, দেশের লকডাউন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রতিটি মসজিদে ইমাম, মুআজ্জিন, খাদেম প্রমুখ মিলে সর্বমোট ৪/৫জন হয়ে নামাযের জামা‘আতের ব্যবস্থা করুন এবং তারা নামাযের জামা‘আতের আয়োজনের জন্য লকডাউন আইন মেনে মসজিদেই অবস্থান করুন। তারা মসজিদ থেকে বের হবেন না এবং বাহিরের কেউ মসজিদে প্রবেশ করতে পারবেন না। অন্যরা সবাই যার যার বাসায় অবস্থান করে সেখানে সময়মতো নামায আদায় করবেন। এভাবে পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত সকল ওয়াক্তী নামায এবং জুুমু‘আর নামায ও শবে বারাআতের জন্য এ নিয়মই বলবৎ থাকবে।

এরূপ ঘোষণা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলে, দেশের চলমান লকডাউন অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে আশা করি। সুতরাং এ ধরনের ঘোষণা অবিলম্বে প্রদান করার জন্য ধর্মমন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের প্রতি আহবান জানাচ্ছি।

Tagged ,

ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই–তাহলে করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে পারস্পরিক দুরত্ব বজায় রাখতে হবে কেন?

ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে বর্তমান সময়ে একটি বিভ্রান্তি ও তার জবাব

——————————————————————-
মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী
——————————————————————-

.
৥ প্রশ্ন :– ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই অর্থাৎ একজন রোগীর শরীর থেকে তার সংস্পর্শের দ্বারা সেই রোগ অন্যজনের শরীরে যায় না–এটা হাদীসের কথা। তাহলে বর্তমানে করোনা ভাইরাসের ভয়ে নামাযের সময় কেন ফাঁক ফাঁক হয়ে দাঁড়াতে বলা হচ্ছে এবং চলাফেরায় কী কারণে দু’জনের মাঝে অন্তত এক মিটার দুরত্ব বজায় রাখতে বলা হচ্ছে?
.

৥ উত্তর :– হ্যাঁ, মহান আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো মধ্যে কোন রোগ সৃষ্টি হতে পারে না। তাই এমন কোন কথা নেই যে, কেউ কোন রোগীর সংস্পর্শে গেলে তার থেকে সেই রোগ তার মধ্যে যাবে।

তথাপি করোনা ভাইরাসের বর্তমান সময়ে পারস্পরিক দুরত্ব বজায় রাখতে বলা হচ্ছে এ জন্য যে, কোন রোগীর সংস্পর্শে গেলে তার থেকে অন্যজনের মধ্যে সেই রোগ চলে যায় না সত্য, কিন্তু তার সংস্পর্শের কারণে সেই রোগের জীবানু মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তির মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে। এটা মহান আল্লাহর সৃষ্টিগত সে ধরনের রোগের একটি তাছীর।

কিন্তু কারো মধ্যে কোন রোগের জীবানু সৃষ্টি হওয়া মানেই তার সেই রোগ হওয়া নয়। কেননা, চিকিৎসা-বিজ্ঞানের মতে, একটি জীবাণুকে কারো মধ্যে রোগ তৈরীর জন্য তার টক্সিন উৎপাদন ক্ষমতা, দেহকলার অভ্যন্তরে প্রবেশ, উপনিবেশ (কলোনী) তৈরি এবং পোষক ব্যক্তির শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা দমন (immunosuppress) ইত্যাদি বিষয়গুলো অতিক্রম করে যেতে হয়। এমতাবস্থায় কোন রোগের জীবানু কারো শরীরে সৃষ্টি হওয়ার পর তার শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার দ্বারা যদি সেটা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সেই জীবানু তার শরীরে কোন রোগ তৈরী করতে পারে না। আর যদি তার শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকার কারণে জীবানুর কাছে হেরে যায়, তখন জীবানু তার শরীরে টক্সিন উৎপাদন করে দেহকলার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং তার মধ্যে উপনিবেশ তৈরি করার মাধ্যমে তাকে সেই রোগে আক্রান্ত করে।

(বিস্তারিত দেখুন : https://www.wikiwand.com/bn/রোগ_সংক্রামক_জীবাণু )

বস্তুত এমতাবস্থায় সেই জীবানু মহান আল্লাহর ফয়সালা অনুযায়ী কাজ করে। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা সেই ব্যক্তিকে রোগ দেয়ার ইচ্ছা করলে তখন সেই জীবানু তার মধ্যে টক্সিন উৎপাদন করে তার দেহকলার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে উপনিবেশ তৈরী করে তার মধ্যে সেই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটাতে সক্ষম। আর আল্লাহ তা‘আলা সেই ব্যক্তিকে সেই রোগ দেয়ার ইচ্ছা না করলে, তখন সেই জীবানু তার মধ্যে কোন প্রক্রিয়া চালাতে পারে না। বরং তার শরীরের এন্টি বডির সাথে মুকাবিলা করে হেরে গিয়ে সে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা যায়। তখন আর তার সেই রোগ হয় না।

এ জন্য এ ব্যাপারে আমাদের ঈমানকে অটল রাখতে হবে যে, আল্লাহ তা‘আলার হুকুম ছাড়া কারো কোন রোগ হতে পারে না। এমনকি কোন মহামারি রোগীর সংস্পর্শে গেলেও মহান আল্লাহর হুকুম না থাকলে তার সেই রোগ হবে না। আবার কেউ কোন রোগীর সংস্পর্শে না গেলেও আল্লাহ তা‘আলার হুকুম থাকলে তার সেই রোগ হবেই–সে যেখানেই থাকুক না কেন।

তবুও কোন দুরারোগ্য রোগীর সংস্পর্শে গিয়ে কারো মধ্যে সেই রোগের জীবানু সৃষ্টি হলে সে আল্লাহর পরীক্ষায় মধ্যে পড়ে যায়। তাই এক্ষেত্রে রোখসত (হুকুমের ছাড়-জনিত দিক) অবলম্বন করে দুর্বল বান্দা হিসেবে পরীক্ষার স্থল থেকে নিজেকে দূরে রাখার জন্য কোন রোগীর সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে বলা হয়। সেই হিসেবেই করোনার ভয়ে পারস্পরিক দুরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়ে থাকে। যেমন, সর্দি লাগার আশংকায় বেশী ঠাণ্ডা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়। অথচ কারো সর্দি লাগা আল্লাহর হুকুম ছাড়া হতে পারে না।

আর রুখসত হিসেবে দুর্বল বান্দাদের এরূপ পরীক্ষায় পড়া থেকে দূরে থাকা বা সাবধানতা অবলম্বন করাও আল্লাহরই নির্দেশনা–যা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু যারা ঈমানের সুউচ্চ মকামে অধিষ্ঠিত, তারা ‘আযীমত (হুকুমের সর্বোচ্চ দিক)-এর উপর আমল করেন। এ জন্যই এরূপ ব্যক্তিগণের কুষ্ঠরোগীর সাথে বসে খাবার খাওয়ার কথাও হাদীসে রয়েছে।

সার কথা, কেউ কোন রোগীর সংস্পর্শে গেলে তার থেকে সেই রোগ তার মধ্যে যায় না। তবে আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টিগতভাবে কোন কোন রোগের এমন তাছির দিয়েছেন যে, সেরূপ রোগীর সংস্পর্শে কেউ গেলে তার মধ্যে সেই রোগের জীবানু সৃষ্টি হয়। অবশ্য তার দ্বারা রোগ হওয়া বা না হওয়া আল্লাহ তা‘আলার ফয়সালার উপর নির্ভর করে। আল্লাহ তা‘আলা তাকে সেই রোগ দেয়ার ইচ্ছা করলে সেই জীবানু দ্বারা উল্লিখিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার মধ্যে সেই রোগ পয়দা হয়। আর আল্লাহ তা‘আলা তাকে সেই রোগ দেয়ার ইচ্ছা না করলে সেই জীবানু উল্লিখিত প্রক্রিয়ার পথে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে মারা যায়; যার ফলে তার মধ্যে সেই রোগ হয় না। এভাবে হাদীসের কথা যথার্থভাবেই বাস্তবরূপে প্রতিফলিত হয়।

Tagged ,

এপ্রিল ফুল বনাম স্পেনের ঘটনা : সাম্প্রতিক বিতর্ক ও বিভ্রান্তির নিরসন (৪র্থ পর্ব/শেষ পর্ব)

এপ্রিল ফুল বনাম স্পেনের ঘটনা :

সাম্প্রতিক বিতর্ক ও বিভ্রান্তির নিরসন

(৪র্থ পর্ব/শেষ পর্ব)

————————————-
মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী
————————————-

.

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

॥ গ ॥

স্পেনের ঘটনার সাথে এপ্রিল ফুলের সম্পর্ককে অস্বীকারকারীগণ আরো দাবী করেছেন যে, নিরাপত্তার ঘোষণা দিয়ে মুসলমানদেরকে মসজিদে ঢুকিয়ে তালাবদ্ধ করে আগুন লাগিয়ে দেয়ার কোন ঘটনা ঘটেনি। তেমনি মুসলমানদেরকে জাহাজে তুলে তা ডুবিয়ে দিয়ে হত্যা করার ঘটনাও ঘটেনি।

এ সম্পর্কে জবাব হলো–স্পেনের মুসলমানদের উপর গণহত্যা চালানোর ঘটনা বর্ণনায় বিভিন্ন দেশে কিছুটা পার্থক্য প্রত্যক্ষ করা গেলেও মূল ঘটনা সম্পূর্ণ সঠিক। নিঃসন্দেহে সেখানে মুসলমানদেরকে আগুনে পুড়িয়ে এবং জাহাজে ডুবিয়ে মারার ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। যার বিবরণ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

বস্তুত ১৪৯১ সনের ১লা এপ্রিলের ঘটনার পূর্ববর্ণিত ডকুমেন্টে মুসলমানদেরকে যে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে এবং তাদের বাড়ীঘর ও সহায়-সম্পদে আগুন দিয়ে ধ্বংসতাণ্ডব চালানোর বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে, এটা এ ব্যাপারে স্পষ্ট প্রমাণ। বলা বাহুল্য, সে সময় তাদের ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দেয়ার সময় তাদের অনেকে মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলেন, এমতাবস্থায় খৃস্টানরা সেই মসজিদে আগুন লাগিয়ে তাদেরকে হত্যা করে। আবার মুসলমানগণ আত্মরক্ষা করে সমূদ্রপথে উত্তর আফ্রিকার দিকে চলে যাওয়ার সময় তাদের অনেকের জাহাজ মাঝ দরিয়ায় ডুবিয়ে দেয়ার ঘটনারও ঐতিহাসিক বর্ণনা রয়েছে।

এভাবে গ্রানাডায় মুসলমানদের উপর খৃস্টানদের চালানো সীমাহীন জুলুম-অত্যাচার ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাসমূহ পূর্বাপর পর্যালোচনা করলে এপ্রিল ফুলের আলোচিত সেই ঘটনার মূল অংশ ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত হয়। তাই তাকে ভিত্তিহীন বলা যায় না বা অস্বীকার করা যায় না।

উক্ত ঘটনার ঐতিহাসিক ভিত্তির আরো প্রমাণ হলো, উইকিপিডিয়ার তথ্যে ইতিহাসবিদ হার্নান্দো দেল পুলগারের রবাতে পৃথিবীব্যাপী আগুনে পুড়িয়ে জীবন্ত মানুষ হত্যা বা অগ্নিসংযোগের দ্বারা জান-মাল বিনাশের তালিকায় স্পেনে ইনক্যুইজিশনের মাধ্যমে মুসলমানদেরকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। উইকিপিডিয়ার নিম্নোক্ত লিঙ্কে তার স্পষ্ট বর্ণনা দেখুন–

http://en.wikipedia.org/wiki/Execution_by_burning

আবার এ ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ডকুমেন্টারীও তৈরী করা হয়েছে। যেমন, তন্মধ্যের একটি ঐতিহাসিক ডকুমেন্টারী history of April fool শিরোনামে ইন্টারনেটের ইউটিউবে রয়েছে। তার লিঙ্ক নিম্নরূপ–

https://www.youtube.com/watch?v=qFXzEGwMqVA

তেমনি বাংলা টিভি নিউজ-এর পক্ষ থেকে এপ্রিল ফুলের উক্ত ইতিহাস বর্ণনা করে April Fool Brief History শিরোনামে বিশেষ ডকুমেন্টারী প্রকাশ করা হয়েছে। ইন্টারনেটের ইউটিউবে সেই ডকুমেন্টারী নিম্নবর্ণিত লিঙ্কে পাবেন–

https://www.youtube.com/watch?v=trqyj8INp2U

বস্তুত এসব ঘটনার সম্যক উপলব্ধির জন্য স্পেনের মুসলমানদের পূর্বাপর সমস্ত ইতিহাসকে সামনে রাখতে হবে। আর এ ইতিহাস যেহেতু মুসলিম আরবদের সাথে সংশ্লিষ্ট, তাই আরব ঐতিহাসিকগণ থেকে তার অধিক নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে–এটাই স্বাভাবিক। তা ছাড়া খৃস্টান লেখকগণ আর কতটুকু বলবেন যে, খৃস্টানরা স্পেনের মুসলমানদের উপর ইতিহাসের বর্বরতম নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করেছেন?

এ জন্য স্পেনের মুসলমানদের ঘটনা জানতে আরব ঐতিহাসিকগণের তথ্য-ইতিহাসই অধিক উপযুক্ত। তাদের লিখিত স্পেনের ইতিহাসে এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। এ ব্যাপারে বিশদভাবে জানতে আরবী ভাষাবিদগণ বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী ইতিহাসের উস্তায আরব-ইতিহাস গবেষক ড. আবদুর রহমান আলী আল-হাজ্জীর التاريخ الاندلسي من الفتح الا السقوط নামক আরবী ইতিহাসগ্রন্থটি পড়ুন। সেই গ্রন্থটি ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। তার ডাউনলোড লিঙ্ক হচ্ছে–

http://www.4shared.com/office/2Cg7qZ7Dce/ _____.html?cau2=403tNull&ua=WINDOWS

এ ছাড়াও আরবীয় ইতিহাস-গবেষক ড. আলী আল-মুনতাসির আল-কাত্তানীর লিখিত انبعاث الاسلام في الاندلس আরবী কিতাবটি এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু খুবই তথ্যবহুল। সেই কিতাবটি ইন্টারনেটে মাকতাবায়ে শামেলা থেকে ডাউনলোড করার লিঙ্ক হলো–

http://shamela.ws/index.php/book/37481

আর যদি সবিস্তরভাবে স্পেনের ইতিহাস এটুজেড কেউ জানতে চান, তাহলে প্রখ্যাত আরব ঐতিহাসিক আল-মাক্বক্বারী (অনেকে তার নাম মুকরী বলেন, তা ভুল) যার পূর্ণ নাম শাইখ আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল-মাক্বক্বারী আত-তিলমিসানী–তার ৮ খণ্ডে লিখিত نفح الطيب من غصن الاندلس الرطيب (নাফহুত্ব ত্বীব মিন গুসনিল উনদুলুসির রত্বীব) নামক বৃহদাকার আরবী গ্রন্থ এ জন্য বেশ উপযোগী। তার উক্ত গ্রন্থের সবগুলো খণ্ড ইন্টারনেটে “আল-মাকতাবাতুল ওয়াক্বফিয়্যা” ওয়েবসাইটের নিম্নবর্ণিত লিঙ্ক থেকে ডাউনলোড করতে পারেন–

http://waqfeya.com/book.php?bid=7608

এ ছাড়াও এ বিষয়ে আরব ইতিহাসবিদগণের নির্ভরযোগ্য অনেক গ্রন্থ রয়েছে, যেমন, তন্মধ্য হতে কয়েকটি হচ্ছে–
* হুসাইন মুনিস লিখিত (২ খণ্ড) : موسوعة تاريخ الاندلس
* আবদুল্লাহ ইনান লিখিত : دولة الاسلام في الاندلس
* আবদুহু হাতামালাহ লিখিত : الاندلس : التاريخ والحضارة والمحنة
* ইবনে আযারী লিখিত (৪ খণ্ড) : البيان المغرب في اخبار الاندلس
* আলী আশ-শাত্তাত লিখিত : تاريخ الاسلام في الاندلس
* ইউসুফ আশবাখ লিখিত : تاريخ الاسلام في عهد المرابطين

——————————————
.
॥ ঘ ॥

স্পেনের ঘটনার সাথে এপ্রিল ফুলের সম্পর্ককে অস্বীকারকারীগণ ঘোরতর আপত্তি উত্থাপন করে বলেন, এপ্রিল ফুলের সাথে স্পেনের মুসলমানদেরকে ধোঁকা দিয়ে মারার ঘটনা শুধু এদেশেই শোনা যায়। বাংলাদেশ ও বাংলাভাষা ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোথাও এবং অন্য কোন ভাষায় এর অস্তিত্ব নেই। যদি সেই ঘটনা সত্য হতো, তাহলে অন্যান্য দেশে এবং অন্যান্য ভাষায়ও তার আলোচনা থাকতো।

তাদের এ বিভ্রান্তির জবাবে বলছি–এটা তাদের ভুল তথ্য। যা এপ্রিল ফুলের সাথে স্পেনের ঘটনাকে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের অবস্থা সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতাকে প্রকাশ করে।

এপ্রিল ফুলের সাথে স্পেনের মুসলমানদেরকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানোর কাহিনীর বর্ণনা শুধু এ বাংলাদেশে প্রচলিত নয়, বরং পৃথিবীর সব দেশের মুসলমানদের মধ্যে তার প্রচলন রয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন আঙ্গিকে সেই ঘটনা বর্ণনা করা হয় এবং বিভিন্ন দেশে স্পেনের মুসলমানদের সাথে খৃস্টানদের ধোঁকাবাজির বিভিন্ন ঘটনার বরাত দেয়া হয়।

এপ্রিল ফুলকে আরবী ভাষায় كذبة ابريل (কিযবাতু ইবরীল) অথবা كذبة نيسان (কিযবাতু নাইসান) বলে। এর অর্থ–এপ্রিলের মিথ্যা বলা। ইংরেজী এপ্রিল ফুল (April Fool) অর্থ–এপ্রিলের বোকা, একে আরব দেশগুলোতে كذبة ابريل নামে এ জন্য তা‘বীর করা হয়েছে, যেন নামের সাথেই ঘৃণা জুড়ে থাকে এবং এতে স্পেনের মুসলমানদেরকে বোকা প্রতিপন্ন করার মানসা পূরণ না হয়, বরং তাদের সাথে খৃস্টানদের মিথ্যা বলার ইতিহাসই প্রতিফলিত হয়। আর এর ভিত্তিতেই আরব কান্ট্রিগুলোতে এপ্রিল ফুল নিয়ে আলোচনায় মিথ্যা বলার খারাবি এবং তৎসঙ্গে স্পেনের মুসলমানদের সাথে খৃস্টানদের প্রতারণার ঘটনা নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা করা হয়।

আরব রাষ্ট্রসমূহের বিভিন্ন দ্বীনী প্রতিষ্ঠান, উলামায়ে কিরাম, সামাজিক সংগঠন প্রভৃতি সকল মহল থেকে এপ্রিল ফুলের প্রসঙ্গের সাথে স্পেনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এমনকি সৌদী আরবের রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ ইসলামী গবেষণা বোর্ড “লাজনায়ে দায়েমা (اللجنة الدائمة للبحوث العلمية والإفتاء في المملكة العربية السعودية)”-এর পক্ষ থেকেও এপ্রিল ফুলের সাথে স্পেনের ঘটনাকে সম্পৃক্ত করে আলোচনা করা হয়েছে।

সৌদী আরবের সরকারী সর্বোচ্চ গবেষণা ও ইফতা বোর্ড “লাজনায়ে দায়েমা”র ইলমী পর্যালোচনা ও ফাতওয়া কেন্দ্র “আর-রিয়াসাতুল আম্মাতু লিল বুহুসিল ইলমিয়্যা ওয়াল ইফতা (الرئاسة العامة للبحوث العلمية والإفتاء)”-এর পক্ষ থেকে এপ্রিল ফুল সংক্রান্ত ফাতওয়ায় (ফাতওয়া সংকলন, খণ্ড নং ৩৮ ও পৃষ্ঠা নং ২৬৯-২৭০) এপ্রিল ফুলের আলোচনায় খৃস্টানদের ধোঁকা ও মিথ্যার উৎসবের সাথে স্পেনের ঘটনার যোগসূত্রতার কথা উল্লেখ করে প্রসিদ্ধ স্পেনীয় ঐতিহাসিক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আন্নানের ইতিহাসগ্রন্থ “নিহায়াতুল উনদুলুস”-এর তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ডের বরাতে স্পেনে মুসলমানদের সাথে খৃস্টানদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির দ্বারা ধোঁকা ও প্রতারণা করার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। তার বিস্তারিত তথ্য দেখুন “লাজনায়ে দায়েমা”র “আর-রিয়াসাতুল আম্মাহ”-এর নিম্নোক্ত ওয়েব সাইটে–

http://www.alifta.net/Fatawa/fatawaDetails.aspx…

উক্ত প্রামাণ্য তথ্যে এপ্রিল ফুলের সাথে সংশ্লিষ্ট করে খৃস্টানরা স্পেনের ক্ষমতা গ্রহণের পর ‍মুসলমানদের উপর যে চরম জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে তাদেরকে ফাঁদে ফেলে তাদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের সীমাহীন বর্বরকাণ্ড ঘটিয়েছে, সেসব ঘটনার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়াও আরব রাষ্ট্রসমূহে বিশেষভাবে স্পেনের মুসলমানদের গোড়ার ইতিহাস উল্লেখ করে এপ্রিল ফুলের সাথে তার যোগসূত্রতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। যার উপর ভিত্তি করে খৃস্টানরা ধোঁকায় ফেলে মুসলমানদের ঈমানী শক্তিকে নস্যাৎ করেছে। এপ্রিল ফুলের সাথে যোগসূত্র স্থাপন করে স্পেনের মুসলমানদের গোড়ার সেই ইতিহাস বর্ণনা করে সৌদী আরবের প্রসিদ্ধ মুহাক্কিক আলেম শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ গুরুত্বপূর্ণ হিদায়াত পেশ করেছেন। উক্ত হিদায়াতে তিনি বলেন–

وكتب بعضهم عن أصل هذه الكذبة قائلاً:
الكثير منا يحتفل بما يسمونه كذبة إبريل والترجمة الحرفية لها ” خدعة إبريل ”
ولكن كم منا يعرف الحقيقة المرّة الخفية وراء ذلك.
عندما كان المسلمون يحكمون أسبانيا قبل حوالي ألف سنة كانوا في ذلك الوقت قوة لا يمكن تحطيمها وكان النصارى الغربيون يتمنون أن يمسحوا الإسلام من العالم ولقد نجحوا إلى حد ما.
ولقد حاولوا الحد من امتداد الإسلام في أسبانيا والقضاء عليه ولم يفلحوا، حاولوا مرات عديدة ولم ينجحوا أبدا.
بعد ذلك أرسل الكفار جواسيسهم إلى أسبانيا ليدرسوا ويكتشفوا سرة قوة المسلمين التي لا تهزم فوجدوا أن الإلتزام بالتقوى هو السبب.
عندما اكتشف النصارى سر قوة المسلمين بدأوا في التفكير في استراتيجية تكسر هذه القوة وبناءا عليه بدأوا بإرسال الخمور والسجائر إلى أسبانيا مجانا.
هذا التكتيك (الطريقة ) من الغرب أعطت نتائجها وبدأ الإيمان يضعف عند المسلمين خاصة في جيل الشباب بأسبانيا. وكانت نتيجة ذلك أن النصارى الغربيين الكاثوليك أخضعوا كل أسبانيا تحت سيطرتهم منهين بذلك حكم المسلمين لذلك البلد الذي دام أكثر من ثمانمائة سنة. سقط آخر حصن للمسلمين وهو غرناطة في أول إبريل. ولذلك اعتبروها بمعنى خدعة إبريل (APRIL FOOL.
ومن تلك السنة إلى الآن يحتفلون بذلك اليوم ويعتبرون المسلمين حمقى. فهم لا يجعلون الحماقة وسهولة المخادعة في جيش غرناطة فقط بل في جميع الأمة الإسلامية. وعندما نحضر هذه الاحتفالات فإنه نوع من الجهل وعندما نحاكيهم المحاكاة العمياء في اللعب بهذه الفكرة الخبيثة فهو نوع من التقليد الأعمى الذي قد يؤكد غباء بعضنا في اتباعهم. ولو علمنا بسبب الاحتفال لما أمكن أن نحتفل بهزيمتنا أبدا.
وبعد أن عرفنا الحقيقة دعونا نقطع وعدا على أنفسنا بأن لا نحتفل بذلك اليوم. يجب علينا أن نتعلم دروسا من الأسبان ونصبح مطبقين حقيقة للإسلام ولا نسمح لإيماننا بأن يضعف أبدا. انتهى

অর্থ : “অনেক ঐতিহাসিক এপ্রিল ফুলের মূল কারণ সম্পর্কে বলেন–আমাদের বহু সংখ্যক লোক এপ্রিল ফুলের অনুষ্ঠান করেন এবং একে অপরকে ধোঁকা দেয়ার প্রথা উদযাপন করেন, কিন্তু আমাদের কতজন এর অন্তরালের আসল গোপন তিক্ত খবর জানেন? সেটা হলো : হাজার বছর আগে যখন মুসলমানগণ স্পেন শাসন করতেন, সে সময় মুসলমানদের শক্তি ছিলো অপ্রতিরোধ্য। খৃস্টান ও পশ্চিমারা চায় ইসলামকে পৃথিবী থেকে মিটিয়ে দিতে। তাতে তারা কিছুটা সফলও হয়েছে। সেভাবে তারা স্পেনে ইসলামের বিস্তারকে সীমিত ও রোধ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সফল হয়নি। এ ব্যাপারে তারা কয়েকবারই চেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু কখনো কামিয়াব হতে পারেনি। এরপর কাফের-খৃস্টানরা স্পেনে গোয়েন্দা পাঠালো, যেন তারা তদন্ত করে দেখে এবং মুসলমানদের অপরাজিত শক্তির রহস্য বের করে। তখন তারা জানতে পারলো যে, মুসলমানদের ঈমানী তাক্বওয়াই তাদের বিজয় লাভের একমাত্র কারণ। খৃস্টানরা যখন মুসলমানদের সেই শক্তির ভেদ জানতে পারলো, তখন তাকে খর্ব করার কৌশল নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলো। সেই ভিত্তিতে তারা স্পেনে নানারকম বাহারী মদ ও সিগারেট ফ্রি পাঠাতে শুরু করলো। পশ্চিমাদের এ কৌশল ফলপ্রসূ হলো এবং মুসলমানদের ঈমান দুর্বল হতে থাকলো। বিশেষ করে স্পেনের যুবক শ্রেণীর মধ্যে তা প্রকট রূপ ধারণ করলো। আর এর ফলাফল এই হলো যে, পশ্চিমা ক্যাথলিক খৃস্টানরা গোটা স্পেনকে তাদের করতলে নিয়ে নিলো–যেখানে মুসলমানরা দীর্ঘ আট শ’ বছরের অধিক কাল রাজত্ব করেছে। সেখানে মুসলমানদের সর্বশেষ ঘাটি গ্রানাডার শাসন ক্ষমতার অবসান হয় ১লা এপ্রিলে। এ জন্য খৃস্টানরা একে এপ্রিলের ধোঁকারূপে বিবেচনা করে এপ্রিল ফুল পালন করে। সেই বছর থেকে আজ পর্যন্ত তারা এ ‘এপ্রিল ফুল’ উদযাপন করছে এবং মুসলমানদেরকে বোকা সাব্যস্ত করছে। এতে তারা এ বোকা বানানোর কৌতুক শুধু গ্রানাডার মুসলিম সেনানীদের নিয়ে করছে না, বরং তামাম উম্মতে মুসলিমাকে নিয়ে উপহাস করছে। এ জন্য যখন আমরা এ ‘এপ্রিল ফুল’ পালনে অংশ নেই, তা আমাদের এক ধরনের আত্মঘাতিমূলক মুর্খতার প্রমাণ বহন করে। এ নিকৃষ্ট খেলায় যখন আমরা অন্ধ হয়ে তাদের সঙ্গ দেই, তখন আমরা আমাদেরকে নিয়ে তাদের খেলারই অন্ধ সঙ্গী হয়ে যাই। অতএব, সাবধান! যখন এপ্রিল ফুল উদযাপনের এ কারণ সম্পর্কে আমরা জানলাম, তখন কিছুতেই এটা পালন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হতে পারে না।”

শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ সাহেবের উক্ত বয়ানটিকে সৌদী আরব ভিত্তিক বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটে ইসলাম প্রচার সংস্থা IslamHouse.com তাদের ওয়েব সাইটে كذبة ابريل حقيقتها وحكمها শিরোনামে বই আকারে প্রকাশ করেছে। তাদের ওয়েব সাইট থেকে উক্ত পুস্তিকাটি পড়তে কিংবা ডাউনলোড করতে লগইন করুন–

https://islamhouse.com/ar/articles/199745/

এ ছাড়াও শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ এপ্রিল ফুল নিয়ে সম্প্রতি আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ তাকরীর পেশ করেছেন। উক্ত তাকরীরে তিনি বলেন–

وبعضهم كالإنجليز يسمونه يوم الحمقى والمغفلين، ويقال: إن ذلك كان من تهكم الكفار بالمسلمين الذين كانوا في الأندلس، فإنهم لما أحاطوا بهم بالمؤامرات، ومكروا بهم، واتبعوا تلك الطرق والحيل الخبيثة، اعتبروا سقوط آخر حصن للمسلمين في غرناطة في أول إبريل هو خدعة إبريل، ويوم الحمقى يقصدون به المسلمين

অর্থ : “অনেক মানুষ যেমন ইংরেজরা এপ্রিল ফুল দিবসের নাম দিয়েছে বোকা ও নির্বোধদের দিবস। এর হাকীকত সম্পর্কে উল্লেখ করা হয় যে, এ খৃস্টান-কাফেররা স্পেনের মুসলমানদের সাথে এমনই বোকা বানানোর ঘটনা ঘটিয়েছিলো। বস্তুত যখন খৃস্টানরা মুসলমানদের সাথে বিভিন্ন ফন্দি ও চক্রান্ত করেছে, মুসলমানরা তা না বুঝে সেই পথে পা বাড়িয়েছে এবং তাদের নিকৃষ্ট চক্রান্তের খপপরে পড়েছে। সেটাকে উপলক্ষ করেই খৃস্টানরা ১লা এপ্রিলে স্পেনের সর্বশেষ মুসলিম ঘাটি গ্রানাডার পতনকে এপ্রিল ফুল নাম দিয়ে উদযাপন করছে। এটাই হচ্ছে এপ্রিলের বোকা বানানোর রহস্য এবং এটাই খৃস্টানদের বোকা দিবস–যার দ্বারা তারা মুসলমানদেরকে নিয়ে উপহাস করে।”

শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ সাহেবের উক্ত বয়ানের অডিও ও সফট কপি তার নামে প্রতিষ্ঠিত ওয়েব সাইটে পাওয়া যায়। তা পেতে বা ডাউনলোড করতে সেই ওয়েব সাইটের নিম্নোক্ত লিঙ্কে লগইন করুন–

https://almunajjid.com/6032

এভাবে আরব দেশসমূহে ব্যাপকভাবে এপ্রিল ফুল সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে স্পেনের ঘটনাকে তার সাথে সম্পৃক্ত করে বর্ণনা করা হয়। এমনি আলোচনা রয়েছে হাওয়ামিরুল বূরাসাতিস সাউদিয়্যা (هوامير البورصة السعودية)-এর ওয়েব সাইটে। তার শিরোনাম হলো– ما معنى كذبة ابريل بمناسبة شهر ابريل (এপ্রিলের সংশ্লিষ্টতায় এপ্রিল ফুলের অর্থ কী?) সেখানে এপ্রিল ফুলের উদ্ভব সম্পর্কে শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ সাহেবের অনুরূপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেই বর্ণনা দেখুন তাদের নিম্নোক্ত ওয়েব সাইটে–

https://hawamer.com/vb/showthread.php?t=1023931

এমনিভাবে সৌদী আরবের মুআসসাসাতুল ইয়ামামাতুস সাহফিয়্যা (مؤسسة اليمامة الصحفية)-এর নিউজ পোর্টাল “الرياض (আর-রিয়াজ)” জার্নালে كذبة ابريل (কিযবাতু ইবরীল) শিরোনামে এপ্রিল ফুলের আলোচনায় খৃস্টানদের কর্তৃক স্পেনের মুসলমানদেরকে ধোঁকা দিয়ে বিপর্যস্ত করার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। সেই আলোচনা তাদের উক্ত “আর-রিয়াজ” নিউজ পোর্টালের নিম্নোক্ত ওয়েব সাইটে পাবেন–

http://www.alriyadh.com/143792

তেমনি সৌদী আরবের ইলমী গবেষণা মজলিস “মুনতাদাত আরব কিউ” ( منتديات عرب كيو) বা আরব কিউ ফোরামের পক্ষ থেকে এপ্রিল ফুলের আলোচনায় স্পেনের মুসলমানদের ইতিহাস বর্ণনা করে তাকে এপ্রিল ফুলের উৎস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উক্ত আলোচনা তাদের নিম্নবর্ণিত ওয়েব সাইটে দেখুন–

http://www.arabq.com/vb/archive/index.php/t-14151.html

অনুরূপভাবে ফিলিস্তীনের সামাজিক প্রতিষ্ঠান شبكة فلسطين (শাবকাতু ফিলিস্তীন)-এর পক্ষ থেকে كذبة ابريل والسياسة الدولية শিরোনামে এপ্রিল ফুল-এর আলোচনায় স্পেনের মুসলমানদের ইতিহাস সম্পর্কে আলোকপাত করে তার মাধ্যমে এপ্রিল ফুলের সূচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উক্ত প্রতিষ্ঠানের সেই আর্টিক্যাল তাদের নিম্নোক্ত ওয়েব সাইটে পাবেন–

https://www.paldf.net/forum/showthread.php?t=57547

তেমনি আরব দেশসমূহের উলামা-মাশায়িখে কিরাম তাঁদের বয়ান ও খুৎবায় এপ্রিল ফুলের উদ্ভব বা উৎসের বর্ণনায় স্পেনের মুসলমানদের সেই ঘটনা তুলে ধরেছেন। যেমন, কুয়েতের আল-যাহরাহ’র অন্তর্গত আল-ক্বাসর এলাকার মসজিদে সালামাহ’র খতীব শাইখ বাসসাম সাহেব এপ্রিল ফুল সংক্রান্ত খুৎবায় স্পেনের মুসলমানদেরকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে সীমাহীন নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালানোর বিষয় আলোচনা করেছেন। তার উক্ত খুৎবাহ ইন্টারনেটের ইউটিউবে নিম্নোক্ত লিঙ্কে পাবেন–

https://www.youtube.com/watch?v=7TFqtZ9aquU

অপরদিকে পাকিস্তান ও তৎপার্শ্ববতী দেশসমূহে স্পেনের মুসলমানদের শেষ দিকের ইতিহাস নিয়ে এপ্রিল ফুলের আলোচনা করা হয়। তা হলো–খৃস্টানরা ২ জানুয়ারী–১৪৯২ ইং চুক্তির মাধ্যমে গ্রানাডার ক্ষমতা লাভ করে পরবর্তীতে মুসলমানদের উপরে ইনক্যুইজিশনের ছত্রছায়ায় নানাভাবে ধোঁকা দিয়ে চরম নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। এভাবে তারা লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে হত্যা করে স্পেনকে তারা সম্পূর্ণরূপে মুসলিমশূন্য করেছে। সে সময় খৃস্টানদের এ নিপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য মুসলমানরা অনেক কাকুতি-মিনতি করে। তখন খৃস্টানরা তাদেরকে জাহাজে করে অন্যত্র চলে যাওয়ার সুযোগ প্রদানের নামে ধোঁকাবাজির আশ্রয় নেয়। তারা মুসলমানদেরকে জাহাজে উঠিয়ে মাঝ দরিয়ায় জাহাজে ফুটা করে তাদেরকে ডুবিয়ে মারে। এরপর খৃস্টানরা মুসলমানদেরকে বোকা বানিয়ে ডুবিয়ে মারার সেই ঘটনা স্মরণ করে এপ্রিল ফুল পালন করে।

পাকিস্তানের করাচির “মাদরাসাতুল কাসিম”-এর পক্ষ থেকে সাইয়্যেদ আবিদ হুসাইন জায়েদী সাহেব তার এপ্রিল ফুল সম্পর্কিত আলোচনায় এ বিষয়টিই তুলে ধরেছেন। তার সেই বয়ান ইন্টারনেটের ইউটিউবে শুনতে লগইন করুন–

https://www.youtube.com/watch?v=boaZPUAs5Io

তেমনি “মুতাকাল্লিমে ইসলাম” খ্যাত পাকিস্তানের মুহাক্কিক আলেম মাওলানা ইলিয়াস গুম্মান সাহেব এপ্রিল ফুল সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে এর সাথে সংশ্লিষ্ট স্পেনের মুসলমানদের ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেছেন। তার উক্ত বয়ান April Fool; A Combination of Sins শিরোনামে ইউটিউবের নিম্নবর্ণিত লিঙ্কে পাবেন–

https://www.youtube.com/watch?v=8lxfbwoU-_Y

অনুরূপভাবে ভারতের হায়দারাবাদের অন্তর্গত গলকোন্দা’র ধানখোটা এলাকার “মসজিদে আবদুর রহমান”-এর খতীব শায়েখ নূরুদ্দীন উমেরী সাহেব এপ্রিল ফুল সংক্রান্ত বয়ানে স্পেনের মুসলমানদের সেই হৃদয়গাঁথা ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তাঁর সেই বয়ান ইন্টারনেটের ইউটিউবে নিম্নবর্ণিত লিঙ্কে পাবেন–

https://www.youtube.com/watch?v=ER86kvRHmQU

অপরদিকে ভারতের নলেজ ফ্যাক্টরী (Knowledge Factory) নামক গবেষণা কেন্দ্র এপ্রিল ফুলের সাথে স্পেনের ঘটনার সূত্রতাকে প্রামাণ্য ভিডিও ডকুমেন্টারী তৈরী করেছে। April Fools History Explained শিরোনামের উক্ত ডকুমেন্টারী ইউটিউবের নিম্নোক্ত লিঙ্কে পাবেন–

https://www.youtube.com/watch?v=go53-qrRT2Q

এভাবে পৃথিবীর সকল দেশেই মুসলমানদের মধ্যে এপ্রিল ফুলের আলোচনায় স্পেনের ঘটনা বর্ণনার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। এর মাধ্যমে স্পেনের খৃস্টানদের কর্তৃক মুসলমানদেরকে বোকা বানিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর লোমহর্ষক কাহিনী বর্ণনা করে মুসলমানদের ঈমানী চেতনাকে জাগ্রত করা হয় এবং এপ্রিল ফুল পালনের বিভিন্ন খারাবির সাথে সেই ঘটনাকে স্মরণ করে মুসলমানদের আত্মমর্যাদাবোধের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।

—————————

এ দীর্ঘ আলোচনার দ্বারা প্রমাণিত হলো–এপ্রিল ফুলের সাথে স্পেনের মুসলমানদের ঘটনার যোগসূত্র ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত রয়েছে। তাই তাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এতে যারা এপ্রিল ফুলের সাথে স্পেনের মুসলমানদের ঘটনাকে অস্বীকার করে মুসলমানদেরকে পুনরায় এপ্রিল ফুলের বোকা বানাতে চাচ্ছেন, তাদের ভুল ভাঙ্গবে আশা করি। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে সহীহ পথে পরিচালিত করুন। আমীন।
.
………………………………………………..
মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী
সম্পাদক, মাসিক আদর্শ নারী
muftishamsabadi@gmail.com

সাদ সাহেব করোনায় আক্রান্ত–এ কথা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়

বিভিন্ন মিডিয়ায় সাদ সাহেবের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য কোন সূত্র থেকে এ ব্যাপারটিকে প্রমাণ করা হয়নি। বরং সাদ সাহেব এক অডিও বার্তায় ডাক্তারের পরামর্শ মতো কোয়ারেন্টাইন করছেন বলে উল্লেখ করায় মিডিয়াগুলো ধরে নিয়েছে যে, সাদ সাহেব করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

কিন্তু এতটুকু সংবাদ দ্বারা সাদ সাহেবের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া প্রমাণিত হয় না। কেননা, কারো কোয়ারেন্টিনে যাওয়ার অর্থ তার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া নয়। যেহেতু কোয়ারেন্টিনে যেতে বলা হয় কারোনার ব্যাপারে সন্দেহ করা হলে বা কোন উপসর্গ পাওয়া গেলে কিংবা কোন আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে থেকে কেউ এলে। আর এসব ব্যাপার তো করোনা ভাইরাস হওয়া বুঝায় না, বরং বেশীর বেশী আশংকা বুঝায়।

তদুপরি কারো করোনা ভাইরাস হওয়া নিশ্চিতরূপে জানা গেলে তাকে কোয়ারেন্টাইনে না নিয়ে বরং হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানে তাকে পরীক্ষা করে পজেটিভ ফলাফল এলে সেভাবে চিকিৎসা দেয়া হয়। এটাই নিয়ম।

নিজামুদ্দীনে অবস্থানরত কয়েকজনের করোনায় মৃত্যুবরণ এবং আারো কয়েকজনের পজেটিভ ফলাফল আসায় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সেখানে থাকা সুস্থদেরকে কোয়ারেন্টাইনে যেতে বলা হয়েছে তাদেরকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য যে, তাদের মধ্যে আরো কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কিনা। সেই ভিত্তিতে সেখান থেকে আসা সবাই কোয়ারেন্টিনে গিয়েছেন। সেভাবে সাদ সাহেবও তাঁর চিকিৎসকের পরামর্শে কোয়ারেন্টিনে গিয়েছেন। কিন্তু এর দ্বারা এটা বুঝায় না যে, সাদ সাহেব করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

আল্লাহ তা‘আলা সাদ সাহেবকে ভাল রাখুন এবং তার ইনফিরাদাতসমূহ থেকে রুজূ করে জুমহুর উলামায়ে কিরামের পরামর্শ মতো দ্বীনের সহীহ মানহাজকে গ্রহণ করার তাওফীক দান করুন–এ দু‘আ করি। আল্লাহ তা‘আলা তাবলীগ জামা‘আতকে সকল প্রকার ফেতনা থেকে হিফাজত করুন। আমীন।
.
৥ মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী || সম্পাদক, মাসিক আদর্শ নারী

Tagged

মাওলানা সাদ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত! জনসমাবেশ করায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি !!

সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজে জমায়েত করায় ভারতের দিল্লির নিজামুদ্দীনের তাবলীগ জামা‘আতের আমীর মাওলানা সাদ কান্ধলভির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দিল্লি পুলিশ। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এফআইআর দায়েরের পর থেকেই তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ। যদিও এখনো পর্যন্ত তার খোঁজ মেলেনি।
এর মধ্যেই মাওলানা সাদ কান্ধলভির করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়। এ অবস্থায় তিনি কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন বলে জানা যায়।
ভারতে দ্রুত হারে বেড়ে চলেছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা। এরই মধ্যে দিল্লির নিজামুদ্দিনে তাবলীগ জামা‘আত-এর সম্মিলনে সব মিলিয়ে প্রায় ৯,০০০ মানুষের জমায়েতের বিষয়টি সামনে আসে। ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া ২১ জনের শরীরে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়েছে। মৃত্যু হয়েছে দু’জনের।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, মনে করা হচ্ছে, অন্তত ৪০০ জন করোনা আক্রান্তের যোগসূত্র রয়েছে এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে। বিষয়টি নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে নিজামুদ্দিন মারকাজের তাবলীগের আমীর ৫৬ বছর বয়সী মাওলানা সাদ কান্ধলভির খোঁজ নেই। গত ২৮ মার্চ থেকে তাকে খুঁজছে পুলিশ।
সূত্রের বরাতে এনডিটিভি বলছে, মাওলানা সাদও করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। দিল্লি পুলিশের বেশ কয়েকটি দল উত্তরপ্রদেশের মুজাফফরনগরেও অভিযান চালিয়েছে। তল্লাশি চলছে রাজধানী দিল্লিতেও। ১৪টি হাসপাতালের সঙ্গেও পুলিশ যোগাযোগ করেছে।
মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগ, তিনি নিজামুদ্দিন মারকাজে মানুষকে জমায়েত হতে উৎসাহ দিয়েছেন। করোনা সংক্রমণ রুখতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও বড় জমায়েতে নিষেধাজ্ঞার সময় তিনি এই কাজ করেছেন। এমনকি তিনি বাড়ি খালি করে দেওয়ার দু’টি পুলিশি বিজ্ঞপ্তিও অগ্রাহ্য করেন।
আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়েছে, একশো বছরের বেশি বয়স নিজামুদ্দীনের ওই বাড়িটির। নিজামুদ্দীনের ওই ঘটনায় মাওলানা সাদ ছাড়াও মারকাযের আরও ছয় জনকে খুঁজছে দিল্লি পুলিশ।
এর মধ্যে ১ এপ্রিল মাওলানা সাদের নামে দু’টি অডিও প্রকাশ্যে আসে। মারকাজ ইউটিউব চ্যানেলে প্রথম অডিওতে বলা হয়েছে, মসজিদই মৃত্যুর জন্য সেরা স্থান।
ইন্ডিয়া টিভির খবরে বলা হয়েছে, ওই অডিও টেপটি গত ১৮ মার্চ ধারণ করা। এতে মাওলানা সাদকে বলতে শোনা যায়, “মসজিদে জড়ো হলে রোগ পয়দা হবে এই চিন্তা সম্পূর্ণ বাতিল চিন্তা। আপনার যদি এই চিন্তা আসে যে, মসজিদে আসার কারণে মানুষ মারা যাবে, তাহলে মৃত্যুর জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হতেই পারে না।”
তবে মহামারি ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে মামলা দায়েরের পর আত্মগোপনে থাকা মাওলানা সাদের দ্বিতীয় অডিওতে তার সূর সম্পূর্ণ ভিন্ন দেখা যায়। এতে তিনি মত পাল্টিয়ে বলেন, “নিঃসন্দেহে পৃথিবীতে যা হচ্ছে তা মানুষের অপরাধের ফল। আমাদের ঘরে থাকা উচিত। এটাই সৃষ্টিকর্তার ক্রোধকে শান্ত করতে পারে। চিকিৎসকদের পরামর্শ মানুন এবং প্রশাসনের সঙ্গে সহায়তা করুন। কোয়ারেন্টাইনে থাকুন, সে আপনি যেখানেই থাকুন না কেন। এটা ইসলাম বা শরিয়ত বিরোধী নয়।“
আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, মাওলানা সাদ নিজেই করোনায় আক্রান্ত। দ্বিতীয় অডিওতেও তার ইঙ্গিত আছে। তিনি সেই অডিওতে বলেন–“আমি দিল্লিতে আজ ডাক্তারেরর পরামর্শ
 মোতাবেক নিজেকে কোয়ারেন্টাইনে নিয়েছি। এটি একীন, তাওয়াক্কুল, ঈমানের মোটেও বিরোধী কাজ নয়। যেখানেই আমাদের জামা‘আত আছে নিজ নিজ সরকারের নির্দেশনা অবশ্যই মেনে চলবেন।”
এর আগে সরকারি নির্দেশ অমান্য করে জমায়েতের মাধ্যমে করোনা ছড়ানোর অভিযোগে তাবলীগ জামাতের শীর্ষ নেতা মাওলানা সাদ কান্ধলভি ও নিজামুদ্দিন মারকাজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে দিল্লি পুলিশ। সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজে তাবলীগ জামা‘আতের বড় জমায়েত হয়েছিল। সেখানে বহু বিদেশি মেহমান ছিলেন বলে জানা গেছে। সেখান থেকে করোনা সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। নিজামুদ্দিনের ওই মসজিদে যোগ দেয়ার পর মোট সাত জন মারা গেছেন। এরই মধ্যে মসজিদটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিপুল সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দিল্লি পুলিশ আগেই নোটিশ দিয়েছিল সাদ সাহেবকে। তবে গত ২৮ মার্চ থেকেই তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টিভির খবরে বলা হয়, ওই জামা‘আত থেকে ফিরে দিল্লিতে ২৪ জন, তেলেঙ্গানায় ৬ জন, আন্দামানে ১০ জন, কাশ্মীরে একজন ও তামিলনাড়ুতে ৫০ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। ওই জামা‘আতে ৮২৪ জন বিদেশি ছিলেন। ইতোমধ্যে পুলিশ সেই তথ্য সংগ্রহ করেছে। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ ওই আবেদনে উল্লেখ করে যে, ওই জামা‘আতে উপস্থিতদের মধ্যে ৯৪ জন ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার, ১৩ জন কিরগিস্তানের, ৯ জন বাংলাদেশের, ৮ জন মালয়েশিয়ার, ৭ জন আলজেরিয়ার। এ ছাড়া তিউনিসিয়া, বেলজিয়াম ও ইতালি থেকে একজন করে এসেছিলেন। বাকিরা ছিলেন ভারতীয়। ওই জামা‘আতে যারা অংশ নিয়েছিলেন তারা শহরের ১৬টি মসজিদে ছিলেন।
এদিকে গত ৩৬ ঘণ্টায় ওই মার্কাজ থেকে ২ হাজার ৩৬১ জনকে সরিয়ে নেয়া হয়। তাদের মধ্যে ৬১৭ জনকে করোনার আলামত থাকায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুরো এলাকা ঘিরে রাখা হয়েছে। এখান থেকে বিভিন্ন রাজ্যে গেছেন মানুষজন। ফলে সব রাজ্যকেই কড়া নজর রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, সাদ সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা ও প্রেফতারী পরোয়ানা জারি করার প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেওবন্দের মুখপাত্র মাওলানা আরশাদ মাদানীসহ ভারতের আলেমগণ। তারা বলেন, নিজামুদ্দীনের সমাবেশের মতো ভারতে অনেক সমাবেশ ইতোমধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা করেছেন। কিন্তু এ্যাকশন শুধু মুসলমানদের উপরে কেন? তা ছাড়া সারাবিশ্বে যেখানে নির্বিচারে মানুষ করোনা মহামারিতে আক্রান্ত হচ্ছে, নিজামুদ্দীনে করোনায় আক্রান্তের ঘটনা সে রকমই। তাই নিজামুদ্দীনের বিরুদ্ধে  এ সাম্প্রদায়িক মনোভাব মেনে নেয়া যায় না।
Tagged ,

এপ্রিল ফুল বনাম স্পেনের ঘটনা : সাম্প্রতিক বিতর্ক ও বিভ্রান্তির নিরসন (৩য় পর্ব)

এপ্রিল ফুল বনাম স্পেনের ঘটনা :

সাম্প্রতিক বিতর্ক ও বিভ্রান্তির নিরসন

(২য় পর্ব)

————————————-
মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী
————————————-

.

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

॥ খ ॥

এপ্রিল ফুলের সাথে স্পেনের ঘটনার যোগসূত্রকে অস্বীকারকারীগণ দাবী করেছেন যে, ১৪৯২ সনের ২রা জানুয়ারী গ্রানাডার ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই হস্তান্তর করা হয়েছিলো।  তখন ক্ষমতা দখলকারী খৃস্টানদের দ্বারা মুসলমানদের মধ্যে কোনরূপ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা হয়নি।

তাদের এ বিভ্রান্তি কথার জবাব এই যে :

১৪৯২ সনের ২ জানুয়ারী গ্রানাডার ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবে হস্তান্তর করা হলেও খৃস্টানরা তার কয়েকমাস আগে গ্রানাডা দখলের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে গিয়ে মুসলমানদের উপর নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে।  যার বর্ণনা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়াও ২ জানুয়ারী গ্রানাডার ক্ষমতা দখল করার পরে ইনক্যুইজিশনের (Inquisition) ছত্রছায়ায় খৃস্টানরা গোটা গ্রানাডায় মুসলমানদের উপর অবর্ণনীয় গণহত্যা চালিয়েছে।  সেই ইতিহাস বড়ই করুণ–সভ্যতার ইতিহাসে যার কোন নজির নেই।  এ সম্পর্কেও পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

তদুপরি উক্ত উভয়প্রকার ইতিহাস গোড়া থেকেই বলছি। ঐতিহাসিকগণের বর্ণনা মতে, স্পেনের মুসলমানদেরকে খতম করার জন্য খৃস্টানরা বহুবার নানাভাবে চেষ্টা করেও কোনক্রমেই যখন যুদ্ধে মুসলমানদেরকে পরাস্ত করতে পারছিলো না, তখন তারা মুসলমানদের শক্তির উৎস কী–তা নিয়ে গবেষণা করলো।  তখন তারা দেখলো যে, মুসলমানরা প্রবল ঈমানী বলে বলিয়ান হওয়ার কারণে তারা সংখ্যায় কম হলেও তাদেরকে পরাজিত করা যাচ্ছে না।  এ বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করে খৃস্টানরা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে মুসলমানদের সেই ঈমানী শক্তিকে খর্ব করার জন্য ফন্দি আঁটলো।  এ জন্য তারা মুসলমানদের মধ্যে বিনামূল্যে মদ, সিগারেট, নর্তকী প্রভৃতি সরবরাহ করলো এবং মুসলিম যুবকদেরকে তাতে বিভিন্ন উপায়ে প্রলুব্ধ করতে প্রয়াস পেলো।  এভাবে খৃস্টানরা ক্রমশ মুসলমানদের ঈমানী শক্তিকে দুর্বল করে তাদেরকে নানারকম ভোগ-বিলাসে মত্ত করে তুললো।  আর সেই সুযোগ গ্রহণ করে তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে পরাজিত করতে সচেষ্ট হলো।

তারপরও মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ শক্তির ভয়ে রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও রাণী ইসাবেলা একবারে গ্রানাডা দখল করার মত দুঃসাহস দেখান নি।  বরং তারা কৌশলী কায়দায় মুসলিম সাম্রাজ্যটাকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে একটু একটু করে দখল করেছেন।

১৪৮৫ সনে রন্ডো এবং ১৪৮৬ সনে গ্রানাডার লজা দখল করেছে রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও রাণী ইসাবেলার যৌথ সেনাবাহিনী। এ সময় খৃস্টান এলাকায় পরিচালিত অভিযানের মুহূর্তে গ্রানাডার শাসক দ্বাদশ মুহাম্মদকে তারা বন্দী করে।  যার কুনিয়াত ছিলো ‘আবু আবদিল্লাহ’ যা সংক্ষেপ করে ‘বু-আবদিল’ নামে তাকে ডাকা হতো।  তাকে বন্দী করার পর নানারকম প্রলোভন দিয়ে তার সাথে তারা গোপন চুক্তি করে।  অতঃপর মিশন বাস্তবায়নে তাকে ছেড়ে দেয়।  এরপর তার সেই গোপন চুক্তি বাস্তবায়নের তৎপরতার মধ্য দিয়ে ১৪৮৯ সনে খৃস্টানরা বাজা দখল করে।  এভাবে আস্তে আস্তে গ্রানাডার একেকটা অঞ্চল দখল করতে করতে খৃস্টান বাহিনী শেষ পর্যন্ত ১৪৯১ সনের ১লা এপ্রিলে মূল গ্রানাডায় প্রবেশ করে।

এ ব্যাপারে বিস্তারিত দেখুন William Montgomery Watt লিখিত A History of Islamic Spain গ্রন্হে।  ইন্টারনেটে তার পিডিএফ কপি পাওয়া যায় নিম্নোক্ত লিঙ্কে-

https://books.google.com.bd/books?id=jzWIgNm1NRYC&pg=PA147&lpg=PA147&dq =islamic+granada&source=bl&ots=MNBBKnwpSB&sig=PwpIjcHlkt2-S52vL7gvu5gv2Z8&hl=en&sa=X&redir_esc=y#v=onepage&q=islamic%20granada&f=false

এভাবে ক্রমশ স্পেনের রাজধানী গ্রানাডার দিকে অভিযান পরিচালনা করে খৃ্‌স্টান বাহিনী যখন গ্রানাডার উপকণ্ঠে এসে পৌঁছে, তখন গ্রানাডার পাদদেশে অবস্থান নেয় এবং কীভাবে গ্রানাডায় ঢোকা যায় সেই পরিকল্পনা করতে থাকে। তখন মুসলমানগণ সেই খৃস্টান বাহিনীকে রুখতে গ্রানাডার সবদিকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তবে গ্রানাডার সুদৃঢ় পাহাড়ের দিকটি প্রাকৃতিক দুর্ভেদ্য ব্যুহরূপে বিদ্যমান ছিলো–যার কারণে মুসলমানগণ সেদিকটার নিরাপত্তার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত ছিলেন বিধায় সেদিকটায় তেমন প্রতিরোধব্যবস্থা করেননি। ১৪৯১ সনের ১লা এপ্রিল মুসলমানদেরকে বোকা বানিয়ে এ সুরক্ষিত পাহাড়ের দিককেই ব্যবহার করে খৃস্টান বাহিনী সন্তর্পনে গ্রানাডার মূল অংশে ঢুকে পড়ে এবং মুসলমানদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়।  তখন তারা মুসলমানদেরকে তাদের বাড়ীঘর ও সহায়-সম্পদসহ পুড়িয়ে মেরে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে গ্রামের পর গ্রাম দখল করে নেয়। এভাবে তারা সম্মুখ যুদ্ধের দ্বারা জয়ের পরিবর্তে নির্মম গণহত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালিয়ে গ্রানাডার মূল শহরে পৌঁছে যায় এবং গোটা শহরকে চারদিক থেকে অবরোধ করে। এরপর গ্রানাডার খাদ্যশষ্যের ক্ষেত্রসমূহকে জ্বালিয়ে মুসলমানদেরকে খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষে ফেলে গ্রানাডার হস্তান্তরে বাধ্য করে।  যার ফলে গ্রানাডার শাসক বু-আবদিল চুক্তিপত্র করে ২ জানুয়ারী গ্রানাডার চাবি রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও রাণী ইসাবেলার হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন।

এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য M. B. Synge লিখিত Brave Men and Brave Deeds ইতিহাস-ডকুমেন্টের THE FALL OF GRANADA অধ্যায়ে দ্রষ্টব্য।  ওয়েব সাইট থেকে তা পড়তে লগইন করুন–

http://www.heritage-history.com/?c= read& author=synge&book=brave&story=granada

তেমনিভাবে এ সম্পর্কে Lost Islamic History ইতিহাস-জার্নালে Granada – The Last Muslim Kingdom of Spain শিরোনামে সবিস্তর আলোচনা করা হয়েছে।  ইন্টারনেট থেকে তা পড়তে লগইন করুন–

http://lostislamichistory.com/granada-the-last-muslim-kingdom-of-spain

বলা বাহুল্য, তখন গ্রানাডা মুসলমানদের অপরাজিত শক্তির শেষ কেন্দ্রবিন্দু ছিলো–যাকে খৃস্টানরা সহজে কব্জা করতে পারছিলো না। এমনকি তারা সেখানকার মুসলমানদেরকে বোকা বানিয়ে সুরক্ষিত পাহাড়ের দিক দিয়ে অতর্কিতভাবে ঢুকে মুসলমানদের বাড়ীঘরে আগুন লাগিয়ে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড না চালালে সেখানে খৃস্টানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সহজ ব্যাপার ছিলো না।  কিন্তু খৃস্টানরা এক্ষেত্রে চাতুর্যপনার আশ্রয় নিয়ে অতর্কিতভাবে প্রবেশ করে মুসলমানদের উপর জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড চালিয়ে গ্রানাডা দখলে নিয়েছে।

মুসলমানদের উপর খৃ্‌স্টানদের চালানো উক্ত নৃশংস হত্যাকাণ্ড ১৪৯১ সনের ১লা এপ্রিলে সংঘটিত হয়েছে।  সুতরাং স্পেনের উক্ত গণহত্যার সাথে এপ্রিল ফুলের সম্পর্ক স্পষ্ট।  যা অস্বীকার করার মতো নয়।

এ ছাড়াও খৃস্টানরা মুসলমানদেরকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়ে ২ জানুয়ারী-১৪৯২ ইং গ্রানাডার চাবি বুঝে নেয়ার পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইতিহাসের চরম নৃশংসতা চালিয়েছে। যার দরুণ পৃথিবীতে একমাত্র স্পেনই এমন দেশ–যেখানে ইসলাম তার মহীরুহে বিকশিত হওয়ার পরও সেই অবস্থায় তার কোন অস্তিত্বই সেখানে বিদ্যমান থাকেনি।  অথচ এ ছাড়া পৃথিবীর যেখানেই ইসলাম গিয়েছে, সেখানেই যে কোন পরিস্হিতিতে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।  চরম পর্যায়ের জুলুম-নিধনের মাধ্যমে খৃস্টানরা স্পেন থেকে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে সমূলে নির্মূল করে।  যার কোন নজির সভ্য পৃথিবীর ইতিহাসে নেই।

এরপর খৃস্টান শাসকগোষ্ঠী গ্রানাডা হস্তগত করার পরই মুসলমানদের সাথে কৃত সহাবস্হানের চুক্তি লংঘন করতে শুরু করে। তারা সেখানকার মসজিদসমূহকে গীর্জায় পরিণত করে।  দুর্লভ কিতাবে ভরপুর আলহামরা প্রাসাদ, বিভিন্ন সমৃদ্ধ লাইব্রেরী, মসজিদ ও মুসলমানদের ঘরসমূহের মূল্যবান ইসলামী কিতাবপত্রগুলোতে আগুন দিয়ে তারা নির্বিচারে ঐতিহাসিক ইসলামী কীর্তিশালা ও ইসলামী ঐতিহ্যের স্মারকসমূহকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে।

এরপর তিনমাস না যেতেই ১৪৯২ সনের ২৯ মার্চ খৃস্টানরা আল-হামরা ডিক্রি (the Alhambra Decree / مرسوم الحمراء) জারী করে প্রথমত ইয়াহুদীদেরকে হয়তো ক্যাথলিক খৃস্টধর্ম গ্রহণ, নয়তো সে দেশ ত্যাগ–এ দু’টির কোন একটি গ্রহণের নির্দেশ দেয়।  আর তার জন্য ২৯ জুলাই পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। অন্যথায় মৃত্যুদণ্ডের হুঁশিয়ারী প্রদান করে।

অপরদিকে তখন মুসলমানদের উপর নানাভাবে নির্যাতন চালিয়ে তাদেরকে কোনঠাসা করে।  অতঃপর এর কয়েক মাস পর ইয়াহুদীদের ন্যায় মুসলমানদেরকেও ব্যাপটাইজ তথা ক্যাথলিক খৃস্টধর্ম গ্রহণ অথবা সে দেশ থেকে বহিষ্কার–এ দু’টোর কোন একটিকে গ্রহণ করতে চূড়ান্ত নির্দেশ জারি করে।  অন্যথায় তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের হুঁশিয়ারী দেয়।  সে সময় খৃস্টানরা ইসলামী পোশাক, ইসলামী ভাষা, ইসলামী ইবাদত-বন্দেগী, ইসলামী চালচলন প্রভৃতির উপর সম্পূর্ণরূপে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আর এসবের কোনটার সামান্য লংঘনের কোনরূপ সন্দেহ হলেই মুসলমানদেরকে গ্রেফতার করে তাদের উপর লোমহর্ষক টর্চার চালাতে থাকে।

তাদের সেই সীমাহীন অত্যাচারে মুসলমানদের অনেকে উত্তর আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলে চলে যেতে বাধ্য হয়।  আর যারা শত জুলুম-অত্যাচার সহ্য করেও সেখানে থেকে যায়, তাদেরকে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়।  কিন্তু যারা তা করেননি, তাদের উপর সীমাহীন অত্যাচার ও নিপীড়ন চালিয়ে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।  তখন নিরুপায় হয়ে অনেক মুসলমান বাহ্যত খৃস্টানধর্ম গ্রহণ করেন, কিন্তু ভিতরে ইসলামকেই লালন করেন।  ইতিহাসে তাদেরকে মরিস্কো বা মুরোস্কী (الموروسكيين) নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

কিন্তু খৃস্টানরা পরবর্তীতে এ মরিস্কোদের উপরেও ইনক্যুইজিশনের ছত্রছায়ায় অকল্পনীয় জুলুম-অত্যাচারের স্টীম রোলার চালায়।  গোপনে ইসলাম পালনের সন্দেহে তাদেরকে ধরে নিয়ে নির্যাতন সেলে আটক করে স্বীকারোক্তি আদায়ের নামে এবং অন্যদের ব্যাপারে জবানবন্দী দেয়ার জন্য তাদের উপর একের পর এক মহা-জুুলুমের খড়গ চালাতে থাকে।  সেই জুলুম-অত্যাচার তাদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যায়। আর যাদের ব্যাপারে কোনরূপ ইসলামের সাথে সম্পর্কের প্রমাণ পায়, তাদেরকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে জীবন্ত পুড়িয়ে মারে। সে সময় সেখানকার কোন মাঠ-প্রান্তর বা রাস্তাঘাট খালি ছিলো না–যেখানে মুসলমানদেরকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার অগ্নিকুণ্ড নির্মাণ করা হয়নি। আবার সে সময় যারা সেই চরম জুলুম থেকে বাঁচার জন্য গোপনে অন্যত্র চলে যেতে চেয়েছে, তাদের গতিরোধ করে বা মাঝ দরিয়ায় তাদের জাহাজকে ডুবিয়ে দিয়ে তারা মুসলমানদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।  (নাউযুবিল্লাহ)

স্পেনে খৃস্টানরা তখন মুহাকামাতুশ তাফতীশ বা দিওয়ানুত তাফতীশ (ইনক্যুইজিশন)-এর মাধ্যমে হাজার হাজার মুসলমানকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে, তাদের সহায়-সম্পত্তি ও বাড়ীঘর আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে সে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে।  এভাবে ইতিহাসের নজীরবিহীন চরম জঘন্য বর্বরতা চালিয়ে সম্পূর্ণ স্পেনকে তারা মুসলিমশূন্য করেছে।

এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য দেখুন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আবু সাঈদ আল-মিসরী লিখিত اخر ملوك المسلمين بالاندلس (আখিরু মুলূকিল মুসলিমীনা বিল উন্দুলুস) নামক ইতিহাস-প্রামাণ্যে। ওয়েব সাইটে তা নিম্নোক্ত লিঙ্কে পাবেন–

http://www.ansarportsaid.net/SpecialFiles/731/Default.aspx

তেমনি আরব ইতিহাস সম্পর্কিত প্রসিদ্ধ গবেষণা প্রতিষ্ঠান النسابون العرب -এর  مأساة مسلمي الاندلس في اسبانيا  নামক গবেষণা-প্রোফাইলে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।  ইন্টারনেটে তা নিম্নবর্ণিত লিঙ্কে পাওয়া যাবে–

http://www.alnssabon.com/t49683.html

এতদ্‌ব্যতীত স্পেনের সেই মরিস্কো মুসলমানদের উপর খৃস্টানদের অবর্ণনীয় নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে সৌদী আরব ভিত্তিক আন্তর্জাতিক দাওয়াহ সংস্হা আল-মুনতাদা আল-ইসলামীর পক্ষ থেকে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।  তাদের সেই প্রতিবেদন لولا التعذيب ومحاكم التفتيش لبقيت اسبانيا مسلمة (অর্থ : যদি অবর্ণনীয় শাস্তি ও টর্চার সেল না হতো তাহলে অবশ্যই স্পেন মুসলিম দেশ থাকতো) শিরোনামে আল-হিলাল সৌদী ক্লাবের নিম্নবর্ণিত ওয়েব সাইটে দেখুন–

http://vb.alhilal.com/t956766.html

সুতরাং স্পেনের ঘটনার সাথে এপ্রিল ফুলের সম্পর্ককে অস্বীকারকারীগণ যে গ্রানাডার হস্তান্তরকে শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলেছেন এবং সেখানে মুসলমানদের উপর কোন গণহত্যা চালানো হয়নি বলে দাবী করেছেন–সার্বিক ঘটনাবলির বিবেচনায় তাকে সত্য বলা যায় না।  উল্লিখিত তথ্যসমূহে গ্রানাডার হস্তান্তরের আগে ও পরে খৃস্টানদের কর্তৃক মুসলমানদের উপর বর্বর গণহত্যা চালানো এবং অগ্নিকুণ্ডে ভষ্মিভূত করার ঘটনার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

.

(পরবর্তী অংশ পরের পোস্টে দেখুন)

 


১ম পর্ব না পড়ে থাকলে এ লিঙ্কে পড়ুন–

এপ্রিল ফুল বনাম স্পেনের ঘটনা : সাম্প্রতিক বিতর্ক ও বিভ্রান্তির নিরসন (১ম পর্ব)

.

২য় পর্ব না পড়ে থাকলে এ লিঙ্কে পড়ুন–

এপ্রিল ফুল বনাম স্পেনের ঘটনা : সাম্প্রতিক বিতর্ক ও বিভ্রান্তির নিরসন (২য় পর্ব)

 

Tagged ,