Monthly Archives: আগস্ট ২০২০

করোনাকালে ৪০ দিন জামাতে নামাজ পড়ে সাইকেল পেল গাজীপুরের ৩ কিশোর

রাহবার: শিশু-কিশোরদের জামাতে নামাজ আদায়ে উৎসাহিত করতে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে গাজীপুর, কালিয়াকৈরস্থ একটি সংস্থা। যারা টানা ৪০ দিন তাকবীরে উলার সাথে জামাতে নামাজ পড়েছে, উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের প্রত্যেককে একটি করে নতুন সাইকেল উপহার দেওয়া হয়েছে।

করোনাকালে যখন নির্দিষ্ট পরিমাণ সংখক মুসল্লি ব্যাতিত মসজিদে জামাতে নামায পড়ার সুযোগ ছিলো না। তখন কালিয়াকৈরস্থ রতনপুরে স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগে নির্মিত হয় অস্থায়ী একটি নামাজের স্থান। আর সেখানে শিশু-কিশোরদের জামাতে নামাজ আদায়ের প্রতি উৎসাহিত করতে নেয়া হয় অভিনব এ উদ্যোগ।

প্রায় দুইমাস আগে কালিয়াকৈর ইসলামী সমাজ কল্যান সংস্থা এ সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের এই উদ্যোগ স্থানীয় শিশু-কিশোরদের মাঝে দারুণ সাড়া ফেলে।

তারা জামাতের সাথে নিয়মিত নামাজ পড়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। ফলে নির্ধারিত দিন শেষে ৩ জন কিশোরকে গত শুক্রবার (২৯ আগস্ট) এক অনুষ্ঠানে নতুন সাইকেল উপহার দেওয়া হয়। স্থানীয় আলেম মাওলানা জাকির হুসাইনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংস্থার চেয়ারম্যন শফিউদ্দিন সরকার ও বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সমাজকর্মী বেলাল হোসাইন প্রমূখ।

সীমিত পরিসরে আয়োজিত প্রথম পর্বে ২০ জন শিশু-কিশোর নিবন্ধিত হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৩ জন টানা ৪০ দিন তাকবীরে উলার সাথে জামাতে নামাজ আদায়ে সক্ষম হয়। ফলে তারা সাইকেল উপহার লাভ করে। আর নিবন্ধিতদের মধ্যে যারা নিয়মিত ৪০ দিন জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেনি, তাদের তাদের বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ উপহার দেওয়া হয়।

তুরস্ক কোনো হুমকিতে মাথা নত করবে না: বিজয় দিবসে এরদোগান

রাহবার: তুরস্ক কোনো হুমকিতে মাথা নত করবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান। চলমান ভূমধ্যসাগর সংকট নিয়ে তিনি এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

রোববার (৩০ আগস্ট) তুরস্কের ৯৮-তম বিজয় দিবস উপলক্ষে আঙ্কারায় এক ভাষণে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এ কথা বলেন। তিনি বলেন, তুরস্ক কোনো হুমকিতে মাথা নত করবে না।

ইয়েনি শাফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশেষ করে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে (ভয় দেখানো বা ব্লাকমেইল করে) তুরস্ক কোনো হুমকিতে মাথা নত করবে না বলে জানান এরদোগান। এতে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি থেকে তার অধিকার রক্ষা করতে হবে।

ভূমধ্যসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে তুরস্কের সঙ্গে গ্রিসের উত্তেজনা চলছে। এরই মধ্যে আইওনিয়ান সাগরে আঞ্চলিক জলসীমা দ্বিগুণ করার ঘোষণা দিয়েছে গ্রিস। এ নিয়ে আঙ্কারার পক্ষ থেকে অ্যাথেন্সকে যুদ্ধের হুমকি দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মিসর ও সাইপ্রাস বড় জ্বালানি খনির সন্ধান পেয়েছে। এরপরই তুরস্ক ওই এলাকায় প্রাকৃতিক সম্পদের খোঁজ পাওয়ার জন্য অতিমাত্রায় তৎপর হয়ে ওঠে। এ নিয়ে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়।

গাজীপুরে নূরাণী বিভাগের জন্য শিক্ষক আবশ্যক

রাহবার: গাজীপুর কালিয়াকৈরস্থ শফিপুর, রতনপুরে অবস্থিত মারকাযুল কুরআন মাদরাসার নূরাণী বিভাগের জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন দক্ষ শিক্ষক আবশ্যক।

আগ্রহী প্রার্থীকে মাদরাসার পরিচালক মুফতী আবু তাহের সিদ্দিকীর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
আগ্রহী প্রার্থীকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ নিচের ঠিকানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

বেতন : আলোচনা সাপেক্ষে

যোগাযোগ: মারকাযুল কুরআন মাদরাসা, রতনপুর, সফিপুর, কালিয়াকৈর, গাজীপুর। ফোন : ০১৭৯৭০৯১৮১৭, ০১৪০৪৮৭১৯২৯।

মেসেঞ্জারে নতুন যেসব সুবিধা

রাহবার: ফেসবুক মালিকানাধীন মেসেজিং প্ল্যাটফরম মেসেঞ্জারে নতুন কয়েকটি প্রাইভেসি সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা পাঠানো বার্তা নিয়ন্ত্রণের সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া মেসেঞ্জার অ্যাপে নতুন সেটিংস পরীক্ষা চালাবে ফেসবুক। এতে মেসেঞ্জারে পছন্দ অনুযায়ী কল ও বার্তা আসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন ব্যবহারকারী। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইনস্টাগ্রামে বর্তমানে চালু থাকা ফিচারের মতোই ফেসবুকে নতুন ফিচার মেসেঞ্জারে আনা হবে। ডিসেম্বর নাগাদ মেসেঞ্জারে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকবে ব্যবহারকারীর হাতে।

ফেসবুকে বন্ধু নয়, এমন কেউ মেসেঞ্জারে কোনো ছবি পাঠালে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝাপসা করে দেবে ফেসবুক। এতে অনাকাক্সিক্ষত ব্যক্তির কাছ থেকে ফেসবুকে ছবি বা বার্তা পাঠিয়ে বিব্রত করা বন্ধ হবে। ফেসবুকের পক্ষ থেকে ‘অ্যাপ লক’ ফিচারটিও আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হচ্ছে। এতে মেসেঞ্জার চ্যাটে বাড়তি আরেক স্তরের নিরাপত্তা যুক্ত হবে। এ পদ্ধতিতে মেসেঞ্জার চ্যাট লক করে রাখা যাবে। মেসেঞ্জারে ঢুকতে হলে ফেস বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে ঢুকতে হবে। এ ফিচারটি এরই মধ্যে আইওএস প্ল্যাটফরমে চালু হয়েছে। শিগগির অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফরমেও এ সুবিধা যুক্ত হবে।

কুরআন পোড়ানোর প্রতিবাদে উত্তাল সুইডেন

রাহবার: মুসলমানদের ধর্মীয়প্রন্থ পবিত্র আল কুরআন পোড়ানোর সুইডেনের দক্ষিণাঞ্চল মালমো শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।।

শনিবার (২৯ আগস্ট) পুলিশ জানায়, শুক্রবার রাতের ওই বিক্ষোভে অংশ নেয় অসংখ্য মানুষ। এসময় পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীদের লক্ষ্য করে চলে জ্বালাও-পোড়াও আর ঢিল ছোঁড়ার ঘটনা ঘটিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা।

স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এর আগে বিকেলে অভিবাসী অধ্যুষিত একটি এলাকার কাছে কুরআন পোড়ায় মুসলিমবিরোধী একদল উগ্র কট্টর ডানপন্থি। ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করে অনলাইনে প্রকাশ করা হয়। এ ঘটনায় ১৩ সন্দেহভাজনের মধ্যে পাঁচজনকে সাম্প্রদায়িক উস্কানির অভিযোগে গ্রেফতারের কথা জানায় পুলিশ। যদিও পরে তাদের সবাইকেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

সূত্র, নিউ ইয়র্ক টাইমস ও রয়টার্স।

মঙ্গলবার থেকে আগের ভাড়ায় চলবে গণপরিবহন

রাহবার: শর্ত সাপেক্ষে প্রত্যাহার করা হয়েছে গণপরিবহনের বর্ধিত ভাড়া। আগামী পহেলা সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) হতে গণপরিবহন আগের নির্ধারিত ভাড়ায় চলাচল করবে। শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে এমনটাই জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

এই ঘোষণায় মঙ্গলবার থেকে বাসের দুই সিটের জায়গায় সিটে একজন করে না বসে আগের মত দুইজনই বসবে। বর্ধিত ভাড়া আর থাকবে না।

করোনার মহামারি প্রতিরোধে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে সরকার। পরে গত ৩১ মে থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন চালুর অনুমতি দেয়। প্রজ্ঞাপন দিয়ে আন্তঃজেলা ও দুরপাল্লার রুটে বাস-মিনিবাস চলাচলের ক্ষেত্রে ২০১৬ সালে নির্ধারিত ভাড়ার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।

বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম কুরআন অনুবাদ করেন একজন আলেম, কোনো হিন্দু নয়

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী: পবিত্র কুরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদ করেন কে? এমন প্রশ্নে অবাক হতে পারেন অনেকেই। এর কারণ হচ্ছে সকলেই জানেন যে, বাবু গিরিশচন্দ্র সেন কুরআনের প্রথম বাংলায় অনুবাদ করেছেন। এ তথ্য অনেক বই-পুস্তকে পাওয়া যায়। অনেকে বিভিন্ন সভাসমাবেশ, সেমিনারেও এতথ্য পরিবেশন করে বিভ্রান্তি ছড়ান। এমনকি পাঠ্যপুস্তকেও দুঃখজনকভাবে এতথ্য পাওয়া যায়। শুধু কি তাই? সরকারি প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত গিরিশচন্দ্র সেনের জীবনী বিষয়ক পুস্তিকাতেও তাঁকে কুরআন শরীফের প্রথম বাংলা অনুবাদক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য এটা নয়।

সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় কুরআন আংশিক অনুবাদ করেন মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া ১৮০৮ সালে। এরপর বাংলা ভাষায় কুরআন পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করেন মৌলভী নঈমুদ্দীন ১৮৩৬ সালে। গিরিশচন্দ্র সেন শুধু উক্ত অনুবাদ পুস্তক আকারে সন্নিবেশ করেন। তাই গিরিশচন্দ্র সেন হচ্ছেন প্রকাশক মাত্র। তাও ৫০ বছরপর ১৮৮৬ সালে। সুতরাং কুরআন শরীফের প্রথম বাংলা অনুবাদক গিরিশচন্দ্র সেন নন। বরং মৌলভী নঈমুদ্দীনই পূর্ণাঙ্গ কুরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক। আর মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া হলেন বাংলভাষায় প্রথম কুরআনের আংশিক অনুবাদক।

উল্লেখ্য, গিরিশচন্দ্র সেনের জন্ম ১৮৩৫ এবং মৃত্যু ১৯১০ সালে। গিরিশচন্দ্রের জন্মেরও আগে অর্থাৎ ১৮০৮ সালে কুরআন বাংলায় অনুবাদের কাজ শুরু করেন মাওলানা আমীর উদ্দীন বসুনিয়া। এরপর গিরিশচন্দ্র সেনের জন্মের এক বছর পরই অর্থাৎ ১৮৩৬ সনে মৌলভী নঈমুদ্দীন পূর্ণাঙ্গ কুরআনের বাংলা অনুবাদ সম্পন্ন করেন। মৌলভী নাঈমউদ্দীন সম্পর্কে তাঁর ছেলে মৌলভী রোকনউদ্দীন আহমদ তাঁদের কুরসিনামা থেকে যেসব তথ্য পরিবেশন করেছেন তাতে দেখা যায়: তাঁদের পূর্বপুরুষ শাহ সৈয়দ মুহাম্মদ খালেদ বাগদাদ থেকে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমন্ত্রণে দিল্লী আসেন। তাঁর অধঃস্তন পঞ্চমপুরুষ সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের দিল্লী থেকে শিক্ষকতার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসেন। এরপর বিবাহ সম্পন্ন হয় এবং মানিকগঞ্জের গালা গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বংশধররা ‘সৈয়দ’ উপাধি পরিত্যাগ করেন এবং গালা গ্রাম থেকে টাঙ্গাইলের করটিয়ার কাছে সুরুজ গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। মৌলভী মুহাম্মদ নঈমউদ্দীন সুরুজ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সলিমউদ্দীন এবং মাতা তাহেরা বানু।

পিতার কাছ থেকে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষা শিক্ষা লাভের পর উচ্চশিক্ষার জন্য নঈমউদ্দীন ঢাকা চলে আসেন এবং আট বছর কাল এক বিশিষ্ট আলেমের তত্ত্বাবধানে থেকে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় এবং হাদিস, তাফসির, ফিকাহ ও মান্তেক প্রভৃতি শাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। এরপর তিনি বিহার, এলাহাবাদ, মুর্শিদাবাদ, জৌনপুর, আগ্রা, দিল্লি প্রভৃতি স্থানে অবস্থান করেন। এসব স্থানের খ্যাতনামা আলেমদের কাছ থেকে অগাধ দীনিইলম আয়ত্ত করেন। তিনি তাঁর সর্বশেষ উস্তাদের কাছ থেকে আলিম-উদ-দহর বা জ্ঞানসমুদ্র উপাধি লাভ করে ৪১ বছর বয়সে টাঙ্গাইলে ফিরে আসেন। সত্যিকার অর্থেই তিনি ছিলেন জ্ঞানসুমদ্র। সেসময় হিন্দুসমাজে যেমন ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মুসলিম সমাজে তেমনই ছিলেন মৌলভী মুহাম্মদ নঈমউদ্দীন।

মৌলভী নঈমউদ্দীনের অর্থসম্পদ ছিল না ঠিক। তবে ছিল জ্ঞান এবং সমাজসেবা করবার মতো তাঁর বিশাল হৃদয়। সেকালের করটিয়ার প্রখ্যাত জমিদার হাফেজ মাহমুদ আলী খান পন্নী তাঁকে সহযোগিতা করবার জন্য এগিয়ে আসেন। করটিয়ায় তিনি স্থাপন করেছিলেন ‘হাফেজ মাহমুদিয়া যন্ত্র’ নামে একটি প্রিন্টিং প্রেস। এ প্রেস তিনি তাঁকে ব্যবহার ও পরিচালনা করতে দিয়েছিলেন। এখান থেকে মৌলভী নঈমউদ্দীন ‘আখবারে এসলামিয়া’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এতে ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে ফিচার ও মুসলিমজাহানের বিশেষ খবরাদি ছাপা হতো। এর প্রতিসংখ্যার সম্পাদকীয় কলামটি ছিল খুব আকর্ষণীয়। তাঁর সমাজ সংস্কারমূলক কাজগুলো পাঠকসমাজে দারুণ সাড়া জাগায়। ‘আখবারে ইসলামমিয়া’ মুসলিম সম্পাদিত পত্রিকাগুলোর মধ্যে ছিল উল্লেখযোগ্য। তৎকালে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সারাদেশে চলতো এ পত্রিকা।

মীর মশাররফ হোসেন এবং মৌলভী নঈমউদ্দীন ছিলেন সেসময়ের দু’জন বিশাল ব্যক্তিত্ব। চিন্তাচেতনা ও জীবনদর্শনের কারণে পৃথক দু’টি ধারায় সাহিত্য রচনা করেন তাঁরা। বলতে গেলে দু’জন ছিলেন দুই দিগন্তের অধিবাসী। মীর মশাররফ হোসেনের ‘গোজীবন’ নামে ৬৬ পৃষ্ঠার একটি বই প্রকাশিত হলে এর কঠোর সমালোচনা করে নঈমউদ্দীন আখবারে এসলামিয়াতে ফতোয়া প্রকাশ করেন। এতে আখবারে এসলামিয়া সম্পাদক ও মীর মশাররফ হোসেনের মধ্যে কলমযুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধ শুধু টাঙ্গাইল-করটিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলা ভারতের বিভিন্ন স্থানে এর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তখনকার বিখ্যাত পত্রিকা ‘সুধাকর’ মীর মশাররফ হোসেনকে সমর্থন করেনি। এ বিরোধের কথা উল্লেখ করে মুন্সী মুহাম্মদ রেয়াজুদ্দীন আহমদ বলেন : ‘যখন প্রধান সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন ‘গোজীবন’ নামক পুস্তক লিখিয়া মুসলমানদিগের গোমাংস ভক্ষণ ও গো কুরবানির বিরুদ্ধে অন্যায় দোষারোপ করিয়া তীব্র মন্তব্য প্রকাশ করেন এবং তদুত্তরে অন্যতম সাহিত্যিক ও ধর্মগ্রন্থ প্রণেতা আখবারে এসলানিয়ার সম্পাদক মৌলভী নঈমউদ্দীন সাহেব ঐরূপ গ্রন্থলেখক মুসলমানের ওপর কাফেরী ফতোয়া দিয়া আখবারে এসলামিয়াতে তা প্রকাশ করিলে মীর সাহেব মৌলবী সাহেবের নামে আদালতে মানহানির মামলা দায়ের করেন। তখন আমরা সুধাকরে অবশ্যই মৌলভী সাহেবের পক্ষ সমর্থন করিতেছিলাম। কিন্তু প-িত (রেয়াজুদ্দীন আহমদ মাশহাদী) সাহেবও এ বিষয়ে আমাদিগকে বিশেষভাবে উজ্জীবিত করিয়া ধর্মের পবিত্র মর্যাদা রক্ষা করিতে অনুরোধ করিয়াছিলেন। তিনি বিপন্ন মৌলভী সাহেবকে নানাপ্রকার সাহায্য করিতে কুণ্ঠিত ছিলেন না। এ ক্ষেত্রে মীর সাহেবের দিকে তিনি আদৌ দৃকপাত করেন নাই।’

মৌলভী নঈমউদ্দীন মীর মশাররফ হোসেনকে কাফের ফতোয়া দিলে টাঙ্গাইল থেকে মীর মশাররফ হোসেন সাহেবের সম্পাদনায় পাক্ষিক হিতকরীতেও বাদানুবাদ শুরু হয় এবং তা দীর্ঘকাল চলে। তারপর পন্ডিত রেয়াজুদ্দীন আহমদ মাশহাদীর চেষ্টাতে শেষপর্যন্ত উভয় পক্ষের একটা মিটমাট হয়ে যায়। মীর সাহেব ‘গৌজীবন’ পুনঃমুদ্রিত করবেন না বলে আশ্বাস দিলে মৌলভী সাহেব তাঁর তারিফ করেন। আদর্শের দিক থেকে দুই সাহিত্যেকের মধ্যে কলমযুদ্ধ হলেও ব্যক্তিজীবনে তাঁদের মধ্যে আন্তরিকতা ছিল প্রচুর। প্রায়ই তাঁরা একত্র মিলিত হয়ে পারিবারিক সুখ-দুঃখ থেকে মুসলমানদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন।

মৌলভী নঈমউদ্দীনের জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ, আল কুরআনের বঙ্গানুবাদ। তাঁর অনুবাদের প্রত্যেকটি আয়াতের অংশসমূহ আলাদা আলাদাভাবে আরবি হরফে মুদ্রিত করে তার নিচে সে অংশের বাংলা তরজমা এবং অপেক্ষাকৃত ছোট অক্ষরে ব্যাখ্যা ও বিস্তৃত তফসির করেছেন। তাঁর অনূদিত কুরআন শরীফ প্রথম খণ্ড ১৮৯১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় খণ্ডের প্রথম সংস্করণ ১৮৯২ সালে হাফেজ মাহমুদ আলী খান পন্নী জমিদার সাহেবের সহায়তায় করটিয়ার মাহমুদিয়া প্রেস থেকে ছাপা হয়। এই প্রেস থেকে তৃতীয় খণ্ডও প্রকাশিত হয়। তৃতীয় খণ্ড ছাপা হবার পর তিনি কোলকাতা চলে যান এবং জলপাইগুড়ির জমিদার খানবাহাদুর রহিম বক্স খানের অর্থানুকূল্যে তাঁর অনূদিত কুরআন শরীফের ৭ম, ৮ম ও ৯ম পারা পর্যন্ত প্রকাশ করেন। ১০ম পারা মুদ্রণ শেষ হবার আগেই ১৯০৮ সালে ২৩ নবেম্বর মৌলভী নঈমউদ্দীন ইন্তিকাল করেন। তিনি সর্বমোট তেইশ পারা পর্যন্ত অনুবাদ করেন। অবশিষ্ট অংশ তাঁর পুত্র কাসেমউদ্দীন ও ফখরউদ্দীন আহমদকে অনুবাদ ও প্রকাশ করবার নির্দেশ দিয়ে যান।

মৌলভী নঈমউদ্দীন ফতোয়ায়ে আলমগিরি বাংলায় অনুবাদ করে চার খণ্ডে প্রকাশ করেন। তিনি বুখারী শরীফেরও অনুবাদ করেন।
অন্যান্য রচনাবলী : মৌলভী নঈমউদ্দীন রচিত আরও কিছু পুস্তক রয়েছে। এগুলো হচ্ছে : ১. কালেমাতল কোফর, ২. এছাবাতে আখের জ্জোহর, ৩. এনসাফ, ৪. রফা-এদায়েন, ৫. আদেল্লায়ে হানিফিয়া, ৬. মায়াদানোল ওলুম, ৭. ইউসুফ সুরার সুবিস্তৃর্ণ তফসির, ৮. সেরাতল মস্তাকিম, ৯. সেরাতল মস্তাকিম (নব পর্যায়), ১০. ধর্মের লাঠি, ১১. বেতের, ১২. তারাবিহ।

এগুলো ছাড়াও পুঁথির ভাষায় এবং পুঁথির আদর্শে আরও কয়েকটি জীবনচরিত লিখেছিলেন। এগুলো হচ্ছে : ১. ছহী শাহ আলমের কিচ্ছা, ২. ছহী শের সাহেবের কিচ্ছা, ৩. ছহী আলমগীরের কিচ্ছা, ৪. ছহী নূরজাহান বেগমের কিচ্ছা, ৫. ছহী আলাউদ্দীনের কিচ্ছা, ৬. ছহী হোসেন শাহের কিচ্ছা, ৭. গোকাণ্ড।
মৌলভী নঈমউদ্দীন তাঁর আরদ্ধ কাজ সম্পন্ন করে যেতে না পারলেও মুসলিমসমাজে আল কুরআনের প্রথম বঙ্গানুবাদক হিসাবে অক্ষয় হয়ে আছেন। এই মহাপুরুষের কর্মতৎপরতায় বাংলার অনেক অমুসলিম তখন ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং মুসলিমদেরও বহু ভ্রান্ত ধারণা দূর হয়। সেসময় মুসলিমসমাজে তাঁর মতো অসাধারণ জ্ঞানী আলেম এবং বহু গ্রন্থপ্রণেতা ও অনুবাদক আর কেউ ছিলেন না। সুবক্তা হিসেবেও তিনি সারাদেশে খ্যাতি অর্জন করেন।

সূত্র, দৈনিক কালেরকণ্ঠ ও সংগ্রাম