এপ্রিল ফুল বনাম স্পেনের ঘটনা : সাম্প্রতিক বিতর্ক ও বিভ্রান্তির নিরসন (১ম পর্ব)

[et_pb_section admin_label=”section”]
[et_pb_row admin_label=”row”]
[et_pb_column type=”4_4″][et_pb_text admin_label=”Text”]

এপ্রিল ফুল বনাম স্পেনের ঘটনা :

সাম্প্রতিক বিতর্ক ও বিভ্রান্তির নিরসন

(১ম পর্ব)

————————————-
মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী
————————————-
.

প্রতি বছর ১লা এপ্রিল ইয়াহুদী-খৃস্টান ও বিভিন্ন জাতির লোকেরা ‘এপ্রিল ফুল’ পালন করে। তাদের দেখাদেখি এ কালচার মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করেছে। তাইতো ১লা এপ্রিল অনেক মুসলিম দেশে এবং আমাদের দেশেও একে অপরকে মিথ্যা বলে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানাতে দেখা যায়।

‘এপ্রিল ফুল’ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে মৌলিকভাবে দু’টি বিষয় সামনে আসে : (এক) এপ্রিল ফুল পালন করা যাবে কি? (দুই) এপ্রিল ফুলের উদ্ভব কীভাবে হলো?

প্রথম বিষয়ের সমাধান হলো–মুসলমানদের জন্য এপ্রিল ফুল পালন করা জায়িয নয়। তা সম্পূর্ণ নাজায়িয ও হারাম।

এর এক কারণ হলো, এটা বিজাতীয় সংস্কৃতি। আর বিজাতীয়দের সংস্কৃতি পালন করা মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ। দ্বিতীয় কারণ (এবং তা-ই এক্ষেত্রে প্রধান কারণ) এই যে, কাউকে মিথ্যা বলা বা ধোঁকা দেয়া জায়িয নয়। এমনকি খেলাচ্ছলে কিংবা মজাক বা ঠাট্টা করেও কাউকে মিথ্যা বলা বা ধোঁকা দেয়া নাজায়িয ও গুনাহর কাজ।

শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীর মন জয়ে অথবা দু’জনের ঝগড়া মেটাতে কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রের বিশেষ বিষয় ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে বানিয়ে কথা বলা বা মিথ্যা বলা জায়িয নয়। তা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন–
إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَاذِبُونَ
“মিথ্যা কেবল তারা রচনা করে, যারা আল্লাহর আয়াত-নিদর্শনে বিশ্বাস করে না এবং তারাই মিথ্যাবাদী।”
(সূরাহ নাহল, আয়াত নং ১০৫)

তেমনি হাদীস শরীফে হযরত বাহয ইবনে হাকিম তার বাবা এবং তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন–
وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ بِالحَدِيثِ لِيُضْحِكَ بِهِ القَوْمَ فَيَكْذِب وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ
“ধ্বংস তার জন্য যে কোন কথা বলে এ জন্য যে, মানুষকে তা দ্বারা হাসাবে, আর এ জন্য সে মিথ্যা বানিয়ে বলে। তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস।”
(জামি‘ তিরমিযী, হাদীস নং ২৩১৫/ সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৯৯০ প্রভৃতি)

সুতরাং এপ্রিল ফুল পালন করা তথা একে অপরকে মিথ্যা বলে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানো কোনক্রমেই জায়িয হবে না। তাই মুসলমানদের তাত্থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য কর্তব্য।

বস্তুত এ মিথ্যা বলে ধোঁকা দেয়া নাজায়িয হওয়ার হুকুমটি ব্যাপক। তাই এপ্রিল ফুল না হয়ে অন্য কোন ব্যাপারে হলেও কিংবা ১লা এপ্রিলে না করে অন্য তারিখে বা অন্য সময়ে করলেও তা জায়িয হবে না। তা সবসময়ের জন্য এবং সব ব্যাপারেই নাজায়িয ও হারাম।

এবার দ্বিতীয় বিষয়ে আসি। এপ্রিল ফুলের উদ্ভব বা উৎপত্তি কখন থেকে এবং কীভাবে হয়েছে বা কোন্ ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে মানুষের মাঝে এপ্রিল ফুলের রেওয়াজ চালু হয়েছে–এবার এ ব্যাপারে আলোচনা করছি।

এপ্রিল ফুলের উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলেন। তবে এসবের কোনটিকেই নিশ্চিতরূপে এর মূল প্রেক্ষাপট বলা যায় না। কারণ, এর কোনটিরই মৌলিকতার পক্ষে অকাট্য কোন প্রমাণ নেই। ইনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকায় এ কথাই বলা হয়েছে– http://global.britannica.com/topic/April-Fools-Day

এপ্রিল ফুলের উৎপত্তি (The Origin of April Fool’s Day) সম্পর্কে বিভিন্ন জনের সূত্রে বর্ণিত বা লোকমুখে শোনা অনুমাননির্ভর ঐতিহাসিক ঘটনার যেসব বিবরণ পাওয়া যায়, তন্মধ্য থেকে কয়েকটি নিম্নরূপ–

১. প্রাচীনকালে ঋতু পরিবর্তনের প্রান্তিক সময় ২৫ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল (অর্থাৎ শীতের শেষে বা বসন্তের শুরুতে) পুরাতন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার (Julian calendar) অনুযায়ী গোটা ইউরোপে সপ্তাহব্যাপী উৎসব চলতো। এ পর্যায়ে বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন বিষয়ের উৎসব হতো। তখন ১লা এপ্রিলে পালন করা হতো একে অপরকে বোকা বানানোর উৎসব। সেই থেকে ১লা এপ্রিলে ‘এপ্রিল ফুল’ বা একে অপরকে বোকা বানানোর প্রথা চালু হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

২. আঠার শতকের আগে গ্রেট বৃটেনে সাধারণ মানুষের ঐতিহ্যবাহী মেলা বসতো প্রতি বছরের পহেলা এপ্রিলে। সেদিন তারা একে অপরকে বোকা বানিয়ে আনন্দ করতো। সেই থেকে এপ্রিল ফুলের সূচনা হয়েছে বলে কেউ কেউ ধারণা করেন।

৩. স্কটল্যান্ডে এই দিনটিকে বলা হত ‘কোকিল শিকারের দিন (hunting the gowk or cuckoo)’। তাকে কেন্দ্র করে এদিন একে অপরকে বোকা বানিয়ে আনন্দ করতে গিয়ে ১৪০০ খৃস্টাব্দের চুসার (Chaucer)-এর The Nun’s Priest’s Tale গল্পের দুই বোকার ৩২ দিনের কাহিনী (Thirty days and two) সামনে আনা হয়–যার শুরুটি হল মার্চের ১ তারিখ এবং শেষদিনটি হলো ১লা এপ্রিল। সেই থেকেই ১লা এপ্রিলে ‘এপ্রিল ফুল’ পালনের প্রথা চালু হয়েছে বলে অনেকে উল্লেখ করেন।

৪. ফ্রেঞ্চরা ১৫০৮ সাল এবং ডাচরা ১৫৩৯ সাল থেকে এপ্রিল মাসের প্রথম দিনকে আনন্দ-কৌতুকের দিন হিসেবে পালন করা শুরু করে। তখন সেখানে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এপ্রিল মাস থেকে বর্ষ গণনা শুরু করা হতো এবং ১লা এপ্রিল ছিলো তাদের নববর্ষের প্রথম দিন। অতঃপর ফ্রান্সের নবম চার্লস (Charles IX) ১৫৬৪ সালে এক ফরমানের মাধ্যমে জানুয়ারী থেকে বর্ষ গণনার ঘোষণা দেন এবং ১লা জানুয়ারীকে নববর্ষের ১ম দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। তখন অনেকেই এ পরিবর্তনকে মেনে নিতে না পেরে এদিনই অর্থাৎ ১লা এপ্রিলেই তাদের পুরোনো নববর্ষ উৎসব চালিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু বিপরীতে ১লা জানুয়ারীর পক্ষের লোকজন তাদেরকে ফাঁকি দিতে তাদের নিকট ১লা এপ্রিলে ভূয়া উপহার পাঠানোর কালচারটি চালু করেন। সেই থেকেই এপ্রিল ফুলের প্রচলন হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

এপ্রিল ফুলের উৎস সম্পর্কে এ রকম আরো বহু ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। বিভিন্ন দেশে এ ব্যাপারে বিভিন্নরকম ঘটনা প্রসিদ্ধ রয়েছে।

তবে এপ্রিল ফুলের উৎস সম্পর্কে আমাদের দেশে একটি ঘটনা সমধিক প্রচারিত। তা হলো–স্পেনের গ্রানাডায় খৃস্টানরা মুসলমানদেরকে বোকা বানিয়ে তাদের উপর নির্মম হত্যাকাণ্ড চালায়। সেদিনটি ছিলো ১লা এপ্রিল। সেই থেকে খৃস্টানরা প্রতি বছর এ তারিখে একে অপরকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে মজা করে ‘এপ্রিল ফুল’ পালন করে। আসুন, এ ব্যাপারে ইতিহাসের তথ্য-প্রমাণ অনুসন্ধান করে দেখি।

…………………………………………………….

(পরের অংশ পরবর্তী পোস্টে দেখুন)

 [/et_pb_text][/et_pb_column]
[/et_pb_row]
[/et_pb_section]

Tagged ,

Leave a Reply

Your email address will not be published.