রাহবার: ঈদগাহ মাঠ উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ হলেও সেই টাকা তুলে নারী ইউপি সদস্যের গোয়ালের গরু ও স্বামীর চিকিৎসা হয়েছে। তবে প্রায় ৪ লাখ ব্যায়ে ঈদগাহ মাঠ হয়েছে এলাকাবাসীর অর্থায়নে। কিন্তু রাতের আঁধারে সেই মাঠে জেলা পরিষদের অর্থায়নের একটি ফলক স্থাপন করে দেন নারী ইউপি সদস্য। এলাকাবাসীর উদ্যোগের মধ্যে জেলা পরিষদের নাম ফলক সাঁটিয়ে টাকা আত্মসাৎ করেছেন এমন অভিযোগ তুলে এলাকার ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে ফলকটি তুলে নিতে বাধ্য হন ওই নারী সদস্য। এমন ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে।

জানা যায়, উপজেলার বড়হিত ইউনিয়নের নওশুতি বাজার জামে মসজিদের ঈদগাহ মাঠ উন্নয়নের জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রদান করে ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ। প্রকল্পটির কাজ জেলা পরিষদের পক্ষ থেকেই বাস্তবায়ন করার কথা। প্রকল্পটির সভাপতি করা হয় বড়হিত ইউনিয়নে ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য রওশন আরাকে। কিন্তু ইতোমধ্যে স্থানীয় এলাকাবাসী ও যুবসমাজ উদ্যোগ নিয়ে মসজিদের সামনে ঈদগাহ মাঠের উন্নয়নের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। এতে ব্যবসায়ী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রদান করে। সেই টাকায় গত রমজানের মধ্যে মাসজিদের সামনের ঈদগাহ মাঠ পাকা করা হয়। কিন্তু এলাকাবাসীর উদ্যোগে নির্মিত কাজের মধ্যে রোবাবর সন্ধ্যার পর মাঠের এক কোনে একটি ফলক সাঁটিয়ে দেন প্রকল্প সভাপতি রওশন আরার স্বামী রফিকুল ইসলাম। পরে সোমবার সকালে স্থানীয় লোকজন মসজিদ মাঠে গিয়ে ফলক দেখে অবাক হয়ে যান। এলাকার লোকজন অর্থসংগ্রহ করে মাঠ নির্মাণ করলেও তাতে ফলক লাগানো হয়েছে- ২ লাখ টাকা ব্যায়ে ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ বাস্তবায়ন করেছে। এতে স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে ফলকটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হন ওই নারী সদস্য।

এর আগে গত ২০১৮-১৯ অর্থ বছরেও নওশুতি বাজার জামে মসজিদটির উন্নয়নের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় জেলা পরিষদ। ওই প্রকল্পটিরও প্রকল্প সভাপতি ছিলেন সংরক্ষিত নারী সদস্য রওশন আরা। অভিযোগ রয়েছে- বারদ্দের অর্ধেক টাকারও কাজ করা হয়নি মসজিদে। মসজিদের সামনে বারান্দা কারার জন্য চার বান্ডেল ঢেউটিন ও কিছু কাঠ দিয়েছিলেন প্রকল্পের টাকা থেকে। গত অর্থবছরে কিছু কাজ হলেও বর্তমান অর্থবছরে কোনো কাজ না করেই শুধু ফলক সাঁটিয়ে টাকা তুলে নিচ্ছেন এমন অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

স্থানীয় যুবক জাহিদুল ইসলাম সজিব বলেন, ‘এলাকার সর্বস্তরের মানুষ মিলে উদ্যোগ নিয়ে মসজিদের সামনে ঈদগাহ মাঠ নির্মাণ করেছেন। কিন্তু তাতে জেলা পরিষদের ফলক লাগিয়ে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করছেন নারী ইউপি সদস্য। এর আগেও নামকাওয়াস্তের কাজ করে টাকা আত্মসাৎ করেছেন ওই নারী।’

বর্তমান মসজিদ কমিটির সভাপতি মাহফুজুল হক বলেন, মসজিদের জন্য কিছু কাজ করে দেওয়ার জন্য নারী সদস্য একটি প্রকল্প আনবেন জানায় তাকে। ঈদের আগে তাকে ২০ হাজার টাকাও দিয়ে গেছে। গেল অর্থবছরেও সম্পূর্ণ কাজ না করে কিছু টিন ও কাঠ দিয়েছিল। বিভিন্ন খরচ দেখিয়ে বাকি টাকার হদিস তাদের দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত রওশন আরা বলেন, তাকে প্রকল্প গুলো পাইয়ে দিয়েছেন জেলা পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য আঞ্জুমান আরা। প্রকল্প দেওয়ার সময় তার সাথে চুক্তি ছিলো বরাদ্দের অর্ধেক টাকা দিয়ে দিতে হবে। গত অর্থবছরে তিনি ৯০ হাজার টাকা পেয়ে নিজের কাছ থেকে আরও ৫ হাজার টাকা যুক্ত করে মসজিদের বারান্দার কাজ করেছেন। এ অর্থ বছরে বরাদ্দ পাওয়ার পর দেখেন ঈদগাহ মাঠের কাজ হয়ে গেছে। ওই অবস্থায় ৯০ হাজার টাকা পাওয়ার পর ৫০ হাজার টাকা জেলা পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য আঞ্জুমান আরাকে দিয়ে বাকি টাকা নিজে নেন। সেখান থেকে ২০ হাজার টাকা মসজিদ কমিটির সভাপতিকে ও ২০ হাজার টাকা নিজের স্বামী ও গোয়ালের গরু অসুস্থ থাকায় চিকিৎসা করেছেন।

তিনি আরও বলেন, মসজিদ কমিটির সভাপতির সাথে কথা বলেই নাম ফলকটি লাগানো হয়েছিল। কিন্তু লোকজনের চাপের মুখে ফলকটি সরিয়ে নিয়েছেন।

জেলা পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য আঞ্জুমান আরা বলেন, গত অর্থ বছরের কাজ যথাযথভাবেই হয়েছে। বর্তমান অর্থ বছরে মাঠের জন্য বরাদ্দ দিলেও আগেই মাঠ নির্মাণ করে ফেলা গেছে। ওই অবস্থায় মাঠের অন্যান্য কাজ করতে প্রকল্প সভাপতিকে বলা হয়েছে। বরাদ্দের অর্ধেক টাকা তাকে দিতে হয়- প্রকল্প সভাপতির এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘এর কি কোনো প্রমাণ আছে’।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন বলেন, জেলা পরিষদ থেকে কি ধরণের প্রকল্প নেওয়া হয় এবং কারা কাজ করে সে বিষয়ে জেলা পরিষদ তদারকি করে। তাদের কিছু জানানো হয় না। মসজিদের বিষয়টি নিয়ে একটি লিখিত অভিযোগ তিনি পেয়েছেন। বিষয়টি জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহীর অনুকুলে পাঠানো হবে।

ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের সচিব সুমনা আল মজিদ বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

-সমকাল