Category Archives: সম্পাদকীয়

নারীর দ্বারা পুরুষকে এবং পুরুষ দ্বারা নারীকে করোনা ভ্যাকসিন দেয়া জায়িয হবে কি?

সম্পাদকীয় : করোনা ভ্যাকসিন নেয়ার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন আলেমদের মাঝে মতভেদ হলেও জরুরী পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তাকে জায়িয ফাতওয়া দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভ্যাকসিন নিতে গিয়ে পুরুষের জন্য নারী-হাতের স্পর্শ নেয়া এবং নারীর জন্য পুরুষ-হাতের স্পর্শ নেয়ার বিষয়টি ইসলামের পর্দা পালনের বিধান অনুযায়ী সঙ্গত হয় না।

অথচ ভ্যাকসিন দিতে গেলে সেই স্থানকে হাত দিয়ে চেপে ধরে কিছুটা উঁচু করে ভ্যাকসিন দিতে হয়। যার কারণে সেখানে স্পর্শের মাসআলাটি সামনে চলে আসে। আর এক্ষেত্রে নারীদেরকে নারীদের মাধ্যমে এবং পুরুষদেরকে পুরুষদের মাধ্যমে ভ্যাকসিন দেয়ার যথোচিত ব্যবস্থা করা অসম্ভব কিংবা দুষ্কর ব্যাপার নয়। সে জন্য এরূপ যথোচিত ব্যবস্থার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ না করে পর্দা লংঘন করে ভ্যাকসিন দেয়ার বিষয়টিকে জায়িয বলা যায় না।

তবে কোথাও সেরূপ ব্যবস্থা করা অসম্ভব বা দুরূহ হলে, সেটা ভিন্ন কথা বা তার জন্য বিকল্পভাবে উপযুক্ত শরয়ী পথ অবলম্বন করা যায়, কিন্তু তা সম্ভব হলে সেখানে সেভাবে নিয়ম বানিয়ে যথোচিত ব্যবস্থা করা কর্তব্য হবে।

নারীদেরকে পুরুষদের থেকে পর্দা করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা সূরাহ আন-নূরে ইরশাদ করেন :

وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَىٰ عَوْرَاتِ النِّسَاءِ

“তারা (নারীরা) যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও বালক–যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ তাদের ব্যতীত কারো সামনে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।”

(সূরাহ আন-নূর, আয়াত নং ৩১)

তেমনি পুরুষদেরকে নারীদের সাথে পর্দা করার নির্দেশ দিয়ে সূরাহ আহযাবে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন–

وَإِذَا سَأَلۡتُمُوْهُنَّ مَتَٰاعٗا فَسۡ‍َٔلُوْهُنَّ مِن وَّرَآءِ حِجَابٖۚ ذَٰلِكُمۡ أَطۡهَرُ لِقُلُوْبِكُمۡ وَقُلُوْبِهِنَّۚ

“তোমরা (পুরুষরা) তাদের (নবীপত্মী ও স্ত্রীলোকদের) কাছ থেকে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এ বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য বেশি পবিত্র।”

(সূরাহ আল-আহযাব, আয়াত নং ৫৩)

অনুরূপভাবে পুরুষদেরকে বেগানা নারীদের নিকট (পর্দাবিহীনভাবে) যেতে নিষেধ করে হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন :

إيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ

“তোমরা পরনারীদের নিকট অনুপ্রবেশ করা থেকে বেঁচে থাকো।“

তা শুনে সাহাবীগণ বললেন : হে আল্লাহর রাসূল! স্ত্রীর নিকট স্বামীর পুরুষ আত্মীয়দের (অনুপ্রবেশের) ব্যাপারে কী বলেন? জবাবে তিনি বললেন : . الْحَمْوُ الْمَوْتُ “স্ত্রীর জন্য স্বামীর পুরুষ আত্মীয়রা তো মৃত্যুর মতো ভয়ঙ্কর।”

(সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫২৩২ ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১৭২)

অপর হাদীসে নারীদের হাত পুরুষদের জন্য স্পর্শ করার নিষিদ্ধতার বিষয় উল্লেখ করে হযরত আয়েশা (রা.) বলেন :

وَاللهِ مَا مَسَّتْ يَدُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدَ امْرَأَةٍ قَطُّ ، غَيْرَ أَنَّهُ يُبَايِعُهُنَّ بِالْكَلَامِ

“আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাত কখনও কোনো নারীর হাত স্পর্শ করে নি। তিনি শুধু কথা বলার মাধ্যমেই তাদের থেকে বাই‘আত-অঙ্গীকার গ্রহণ করতেন।”

(সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৮৯১ ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৬৬)

তেমনি অন্য হাদীসে কোন পুরুষের জন্য কোন বেগানা নারীর হাত স্পর্শ করার ব্যাপারে কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

لأَنْ يُطْعَنَ فِي رَأْسِ أَحَدِكُمْ بِمِخْيَطٍ مِنْ حَدِيدٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمَسَّ امْرَأَةً لا تَحِلُّ لَه

“নিশ্চয়ই তোমাদের কারো মাথায় লোহার পেরেক ঠুকে দেয়া ওই নারীকে স্পর্শ করা থেকে অনেক ভাল–যে নারী তার জন্য হালাল (স্ত্রী) নয়।”

(মু‘জামে কাবীর-তাবরানী, হাদীস নং ৪৮৬)

তাই অপারগতার উজর না থাকলে স্বাভাবিক অবস্থায় নারী পেসেন্টকে নারী-সেবিকার মাধ্যমে এবং পুরুষ পেসেন্টকে পুরুষ-সেবকের মাধ্যমে করোনা ভ্যাকসিন বা অন্য যে কোন ভ্যাকসিন দেয়ার ব্যবস্থা করা আবশ্যক। এটা ইসলামী শরীয়তের অপরিহার্য হুকুম।

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী
সম্পাদক, রাহবার২৪.কম ( www.Rahbar24.com)
সম্পাদক, মাসিক আদর্শ নারী

Tagged ,

থার্টি ফাস্ট নাইট উদযাপনের হুকুম কী?

সম্পাদকীয়: থার্টি ফাস্ট নাইট। খ্রিস্টিয় বছর তথা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের হিসেবে ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ দিবাগত রাত। এ রাতের ১২টা ১ মিনিটকে ‘থার্টি ফাস্ট নাইট’ মুহূর্ত হিসেবে অভিহিত করা হয়। বছরের শেষ রাতের এ মুহূর্তটি উদযাপন একটি খ্রিস্টিয় সংস্কৃতি–যাকে “থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন” বলা হয়। বিশ্বব্যাপী ইসলামিক স্কলাররা ‘থার্টি ফাস্ট নাইট’ উদযাপনকে হারাম বলে আখ্যায়িত করেছেন।

থার্টি ফাস্ট নাইট কোনো ইসলামিক সংস্কৃতি নয়। মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে এটি একটি অপসংস্কৃতি। সে কারণে একজন রুচিশীল ও সচেতন ঈমানদার মুসলমান কখনো থার্টি ফাস্ট নাইট সংস্কৃতি উদযাপন করতে পারেন না।

থার্টি ফাস্ট নাইট খ্রিস্টিয় সংস্কৃতি, মুসলিম সংস্কৃতি নয়, বরং ইসলামের পরিপন্থী কাজ। এ জন্য ইসলামের দৃষ্টিতে তা পালন করা নাজায়িয ও হারাম। অন্য ধর্মের সংস্কৃতি-উৎসব মুসলমানদের জন্য উদযাপন করা বৈধ নয়।

বিজাতীয় সংস্কৃতি উদযাপনে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা এমনই। আল্লাহ তাআলা বলেন–“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের অনুসরণ করবে, কখনো তার সেই আমল গ্রহণ করা হবে না। আর পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।? (সুরাহ আল-ইমরান : আয়াত ৮৫)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি অন্য জাতির সঙ্গে আচার-আচরণে, সভ্যতা-সংস্কৃতিতে সামঞ্জস্য গ্রহণ করবে, সে তাদের দলভুক্ত বলে বিবেচিত হবে।” (আবু দাউদ)

বস্তুত প্রত্যেক জাতির জন্যই রয়েছে তাদের নিজস্ব বিধান ও করণীয়। সে আলোকে মুসলিমদের জন্য রয়েছে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। আল্লাহ তাআলা বলেন–“প্রত্যেক জাতির জন্য আমি একটি নির্দিষ্ট বিধান এবং সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি।” (সুরাহ মায়েদা : আয়াত ৪৮)

মনে রাখা জরুরি–
যে সময়টিতে থার্টি ফাস্ট নাইট উদযাপন করা হয়, সে সময়টি ইসলামে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদার সময়। এ সময় আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর আসমানে এসে বান্দাদেরকে বিভিন্নভাবে দু‘আ করার জন্য আহবান করতে থাকেন। এ সময়টিতে পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে টগবগে যৌবনের লাগামছাড়া উন্মাদনা ও নেশা মেটানোর সময় হিসাবে বেছে নেয়া মারাত্মক অপরাধ।

হুঁশিয়ার হোন। হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা অন্ধকার রাতের ঘনঘটার ন্যায় ফেতনার পূর্বে দ্রুত আমল কর, (যখন)
কোন ব্যক্তি ভোর অতিবাহিত করবে মুমিন অবস্থায়, আর সন্ধ্যা করবে কাফির অবস্থায়, অথবা সন্ধ্যা অতিবাহিত করবে মুমিন অবস্থায়, আর ভোর অতিবাহিত করবে কাফির অবস্থায়। মানুষ তার দ্বীনকে বিক্রি করে দিবে দুনিয়ার সামান্য কিছুর বিনিময়ে।’ (সহীহ মুসলিম)

সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত, থার্টি ফাস্ট নাইট নামক উৎসবে যোগদান কিংবা উদযাপন করা থেকে বিরত থাকা। ইসলাম নির্ধারিত বিধি-বিধান মেনে চলা।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে থার্টি ফাস্ট নাইটের অপসংস্কৃতি থেকে মুসলমানদেরকে হিফাজত করুন। আমীন।

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী
সম্পাদক, রাহবার২৪.কম
সম্পাদক, মাসিক আদর্শ নারী