করোনা মহাকালে প্রশাসনের বক্রদৃষ্টি আর রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ‘ওয়াজ ও আওয়াজ’-এর সুপার পিক টাইম চলছে। সাধারণত মাহফিলের ধরন আর আয়োজকদের রুচির ভিত্তিতে বক্তা আমন্ত্রিত হয়। আর দাওয়াত পেয়ে অনেকেই মওকার ফায়েদা তুলে চৌকা মারে। তাছাড়া ফেসবুক-ইউটিউব ভাইরাল বিবেচনাতেও বক্তা দাওয়াত দেওয়া হয়। আমআদমির কাছে এর আকর্ষণ ব্যাপক। এভাবে দেশব্যাপী ওয়াজ মাহফিলের বিশাল আয়োজন সচল রাখতে নিত্যনতুন বক্তার আবির্ভাব ঘটছে। আর এখান থেকেই বিপত্তি, বিভ্রান্তি এবং বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে। যা ওয়াজ মাহফিল, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন, ওয়ায়েজ এবং আলেম ওলামা কারো জন্যই কল্যাণকর হচ্ছে না।

ওয়ায়েজিনদের সাথে টুকটাক চেনাজানা সূত্রে কোনো কোনো আয়োজক আমাকে বক্তা দিতে অনুরোধ করেন। সে কারণে উঠতি ভাইরাল বক্তাদের প্রতি আয়োজকদের আগ্রহ সম্পর্কে জানা আছে। তাদের মধ্যে সম্প্রতি ফোকাসে এসেছেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম নেত্রকোনা।

ওভার কনফিডেন্স এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের মিশেলে উঁচু আওয়াজের বয়ানে বুঝা যায় নির্দিষ্ট ধরনের মাহফিলে তার ফিউচার ভালো। তার হাত নড়াচড়া দর্শকদের জন্য আকর্ষণীয়। তিনি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব সাহেবের আঞ্চলিক উচ্চারণ এবং মাওলানা মামুনুল হক সাহেবের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বলার স্টাইল রপ্ত করে নিয়েছেন। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী সাহেবের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে-বসেও মনযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এছাড়াও আরো কারণে আয়োজকরা তাকে মঞ্চে উপস্থিত করে দর্শক-শ্রোতাদের চমকে দিতে চায়। কথা প্রসঙ্গে প্রায়ই তিনি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব এবং মাওলানা মামুনুল হক সাহেবাইনের সাথে নিজের নামোচ্চারণ করেন। একজন তরুণের সুদূরপ্রসারি লক্ষ্য ও তাদের কাতারে পৌঁছার স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এতে তেমন আপত্তির কিছু আছে বলে মনে হয় না।

তিনি ফেসবুকে সবসময় সরব থাকেন। কারেন্ট ইস্যুগুলোতে পোস্ট দেন। কিন্তু তার আচরণ আর প্রতিক্রিয়া মাঝেমধ্যে বিরক্তি উৎপাদন করে। ক্ষেত্রবিশেষে দম্ভ আর অহমিকা প্রকাশ পায়। নিজের ব্যাপারে কারো সমালোচনা বা ভিন্নমত নজরে আসার সাথে সাথে তিনি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখান। যে কাউকে তার কল্পিত শত্রুজ্ঞান করে পোস্ট দেন। (দিনকয়েক আগে লিখেছেন, অনেকে তার মতো বক্তা না হতে পেরে হিংসায় তার সমালোচনা করেন। তিনি তৃতীয়/চতুর্থ বক্তা হিসেবে তাদের দাওয়াতের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন! এমন দম্ভ একজন আলেম ও ওয়ায়েজের সাথে মেলে না)

গতকাল হঠাৎ সেই মাওলানা রফিকুল ইসলাম নেত্রকোনা -র নামে ‘মাদানী’ উপাধি ব্যবহারে আপত্তি জানিয়ে উকিল নোটিশ পাঠিয়ে আলোচনায় এসেছেন মদীনা প্রবাসী মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানী।
সাত-আট বছর আগে তিনি মদীনা থেকে বাংলাদেশে এসে হেফাজতে ইসলাম সৌদি আরব শাখার মূল নেতা পরিচয় দিয়ে আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। ঐ সময় তিনি আবার জাতীয়তাবাদী ওলামা দল মদীনা শাখা সভাপতি হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাথেও দেখা করেন। আর ‘জাতীয়তাবাদী ওলামা দল’ এবং ‘আওয়ামী ওলামা লীগ’ কোন কোয়ালিটি ও শ্রেণির মৌলভীরা করে, একথা সবারই জানা।

মদীনা প্রবাসী মাওলানা রফিকুল ইসলাম সম্ভবত কোনোভাবে নভেম্বরে পুনর্গঠিত হেফাজতে ইসলামের কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। আর তিনিই কৌতুককর দৃশ্যের অবতারণা করে মাওলানা রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছেন। যদিও এতে বক্তা মাওলানা রফিকুল ইসলামের লাভই হয়েছে।
কারণ গত জানুয়ারিতে বক্তা সাহেব সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে নিজ নামের ‘মাদানী’ উপাধি কেটে দিয়েছেন। এরপরেও উকিল নোটিশ পাঠানোর কারণে উল্টো মদীনা প্রবাসী ওলামা দল নেতা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন।
দ্বিতীয়ত, দেশের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্রোত অনুপাতে কথা বলার কারণে সম্প্রতি ফেসবুকে আলোচিত মাওলানা রফিকুল ইসলাম উকিল নোটিশের কারণে বিনা ইনভেস্ট ও পরিশ্রমে জাতীয় প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় শিরোনাম হয়েছেন।

এরকম মাথামোটা শিশুতোষ দৃষ্টিভঙ্গির মাওলানা রফিকুল ইসলামরা মাদানীরা কীভাবে হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা হন ভেবে বিস্মিত হতে হয়। তাছাড়া মাদানী উপাধি কেন্দ্রিক তার উকিল নোটিশ জাতির নিকট আলেম সমাজকে হেয় ও হাসির পাত্র বানিয়ে ছেড়েছে।

শেষ কথাটি তরুণ বক্তাকুলের উদ্দেশ্যে। আল্লাহ আপনাদেরকে প্রতিভা, মেধা, অনুকূল সময় ও সুযোগ দিয়েছেন। সেটার অপচয় করছেন কিনা ভেবে দেখবেন। কেউ সমালোচনা করলেই তাকে শত্রু অথবা প্রতিপক্ষ মনে কইরেন না। আপনারা মৌসুমে একবার কোনো এলাকায় গেলেন। কয়েক ঘন্টা থেকে বিদায়ও নিলেন। কিন্তু অদূরদর্শী বক্তব্যে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনকে কতোটা বৈরিতা মোকাবেলা করতে হয়, সেটা আপনাদের অজানা থেকে যায়। তার মানে এটা নয় যে, আপনারা স্রোতের বিপরীতে প্রতিবাদী কথা বলবেন না। অবশ্যই বলবেন। কিন্তু জেলা, অঞ্চল, এলাকা কিংবা প্রতিষ্ঠান খেয়াল করে কথা বললে একূল ওকূল সবই রক্ষা পায়।

ফেসবুক থেকে সংগৃহীত