শায়খ সাজিদুর রহমান


الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه ومن والاه، أما بعد،

ইমাম নববী রহ. – মৃত্যু: ৬৪৩ – তাঁর আরবাঈন কিতাবে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন, যেখানে তিনি সমগ্র হাদীস ভাণ্ডার থেকে চল্লিশটি হাদীস নির্বাচন করে উপস্থাপন করেছেন, যেসব হাদীসে দ্বীনের বিষয়ে মৌলিক, সারগর্ভ ও ব্যাপক মর্মসমৃদ্ধ শিক্ষা ও দিক-নির্দেশনা উল্লেখিত হয়েছে।

হাদীসটিতে প্রত্যেক মুসলমানের জীবনের সকল ক্ষেত্রেই, বিশেষত বর্তমানে করোনার যে নজীরবিহীন দুর্যোগের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, এই পরিস্থিতিতে হাদীসটির শিক্ষা হতে পারে আমাদের জন্য হেফাজতের ওসীলা, পরম রক্ষাকবচ। হাদীসটি এই,

عن عبد الله بن عباس رضي الله عنهما قال: كنت خلف النبي صلى الله عليه وسلم فقال: يا غلام، إني أعلمك كلمات: احفظ الله يحفظك، احفظ الله تجده تجاهك، إذا سألت فاسأل الله، وإذا استعنت فاستعن بالله، واعلم أن الأمة لو اجتمعت على أن ينفعوك بشيء، لم ينفعوك إلا بشيء قد كتبه الله لك، وإن اجتمعوا على أن يضروك بشيء، لم يضروك إلا بشيء قد كتبه الله عليك، رفعت الأقلام وجفت الصحف.

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, একদিন আমি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিছনে ছিলাম। তিনি আমাকে সম্বোধন করে বললেন, “বাছা, আমি তোমাকে কয়েকটি বাণী শিখিয়ে দিচ্ছি। (এক) তুমি আল্লাহর হেফাজত করো, আল্লাহ তোমার হেফাজত করবেন। (দুই) তুমি আল্লাহর হেফাজত করো, আল্লাহকে তুমি তোমার বরাবর পাবে। (তিন) যখন তুমি কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছে চাইবে। (চার) তুমি যখন কিছু সাহায্য চাইবে, আল্লাহর কাছে চাইবে। (পাঁচ) জেনে রাখো, গোটা জাতি যদি কোনো কিছুর মাধ্যমে তোমার উপকারের বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়, তারা কিছুতেই কিছু দিয়ে তোমার উপকার করতে পারবে না তোমার জন্য আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া। গোটা জাতি যদি কোনো কিছুর মাধ্যমে তোমার অপকারের বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়, তারা কিছুতেই কিছু দিয়ে তোমার অপকার করতে পারবে না তোমার বিপক্ষে আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন তা ছাড়া। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং কাগজ শুকিয়ে গেছে।”
(সুনানে তিরমীযী, হাদীস ২৫১৬)

হাদীসটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত শিক্ষণীয়। অতীত যুগের একজন মনীষী বলেছেন, এই হাদীসটি নিয়ে আমি চিন্তা করেছি, গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করেছি। হাদীসটি আমাকে বিমূঢ় করে দিয়েছে। আমার মধ্যে অদ্ভুদ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে চায়। কিন্তু আক্ষেপ, মানুষজন এই হাদীসটির বিষয়ে কী পরিমাণ উদাসীন! এর মর্ম ও শিক্ষা নিয়ে মানুষ কত অল্প চিন্তাভাবনা করে!

কয়েকজন মুহাদ্দিস এই হাদীসের ব্যাখ্যায় স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন। তন্মধ্যে একজন হলেন, ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রহ. (মৃত্যু: ৭৯৫)।

এখানে হাদীসের কয়েকটি অংশ। প্রাসঙ্গিকতার কারণে আমরা এর প্রথম দুয়েকটি অংশ নিয়ে একটু আলোচনা করার প্রয়াস পাবো। দেখুন, এখানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপস্থাপনা লক্ষ্য করুন।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.কে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, إني أعلمك كلمات ‘আমি তোমাকে কিছু কথা শিখিয়ে দিচ্ছি।’ এভাবে ভূমিকা বলে তারপর বিষয়গুলো বলছেন। প্রসঙ্গত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. ছিলেন অল্পবয়স্ক সাহাবীগণের অন্যতম। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওয়াফাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিলো মাত্র তেরো বছর।

অতি মূল্যবান ও অতীব গুরুত্বপূণ কয়েকটি উপদেশ : احفظ الله يحفظك “তুমি আল্লাহকে হেফাজত করো, আল্লাহ তোমার হেফাজত করবেন।” আশ্চর্য, হেফাজত করা হবে আল্লাহর? এবং করবে তা বান্দা? তাহলে এর অর্থ কী? আল্লাহকে হেফাজত করো, অর্থাৎ আল্লাহর হকগুলোর হেফাজত করো, আল্লাহর হকসমূহ জেনে সেগুলো যথাযথ আদায় করার চেষ্টা করো। আল্লাহর সীমারেখারসমূহের হেফাজত করো, আল্লাহর সীমারেখা কখনো লঙ্ঘন করো না। আল্লাহর আদেশ-নিষেধগুলোর হেফাজত করো, আল্লাহর আদেশ-নিষেধগুলো যথাযথ মান্য করো, কখনো এর অন্যথা করো না। এসকল বিষয়ের হেফাজতই আল্লাহর হেফাজত। তাহলেই আল্লাহ তার হেফাজত করবেন। তার দুনিয়ার বৈষয়িক বিষয়াদি, তার নিজ ও পরিবার-পরিজন এবং স্বাস্থ্য-সম্পদ ইত্যাদিরও হেফাজত করবেন আবার তার আখেরাতে মুক্তির উপায় দ্বীন-ঈমানেরও হেফাজত করবেন।

বান্দা যদি আল্লাহর হকসমূহ ও তাঁর বিধিবিধানের হেফাজত করে তাহলে আল্লাহর রাসূলের যবানীতে আল্লাহর ওয়াদা যে, আল্লাহ দুনিয়াতে তাকে বিপদাপদ, বালামুসীবত থেকে হেফাজত করবেন। করোনার এই দুর্যোগে আমাদের রক্ষাকবচ হতে পারে আল্লাহর এই ওয়াদা।

আল্লাহর হকসমূহের মধ্যে, তাঁর বিধিবিধানের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নামাজের হেফাজত করা। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে,

حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَىٰ

তোমরা সকল নামাজের বিষয়ে, বিশেষত মধ্যবর্তী নামাজের যথাযথ হেফাজত করো।
(সূরা বাকারা, আয়াত ২৩৮)

এক হাদীসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

من حافظ على الصلاة ، كان له عند الله عهد أن يدخله الجنة.

যে ব্যক্তি যথাযথভাবে নামাজের হেফাজত করবে আল্লাহর কাছে তার জন্য প্রতিশ্রুতি আছে যে তিনি তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৪২০)

তাছাড়া, নামাজের হেফাজতই হতে পারে দ্বীনের অন্যান্য সকল বিধিবিধান হেফাজতের মাধ্যম। আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. তাঁর খেলাফতের গভর্নরগণকে লিখে পাঠিয়েছিলেন,

إن أهم أمركم عندي الصلاة، فمن حفظها وحافظ عليها حفظ دينه ومن ضيعها فهو لما سواها أضيع.

নিশ্চিত জেনো, তোমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমার কাছে হলো নামাজ। যে নামাজের হেফাজত করবে, নামাজের বিষয়ে যথাযথ যত্নবান হবে সে তার গোটা দ্বীনকে হেফাজত করলো আর যে নামাজের বিষয়ে হেলা-অবহেলা করবে সে অন্যান্য সব বিষয়ের মধ্যে আরো বেশি অবহেলাকারী সাব্যস্ত হবে।
(মুআত্তা মালেক হাদীস ৯)

বর্জনীয় বিষয়গুলো হেফাজতের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হলো, যবান ও লজ্জাস্থানের হেফাজত। জীবনে ও সমাজে যত অনিষ্ট, ঝগড়া-বিবাদ, মিথ্যা-প্রতারণা, অশ্লীলতা-বেহায়াপনা, ইত্যাদি সবগুলোরই মূলে হলো এই দুই জিনিসের হেফাজত না হওয়া।

এই জন্যই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীস শরীফে ইরশাদ করেছেন,

من حفظ ما بين لحييه ، وما بين رجليه ، دخل الجنة

যে ব্যক্তি তাঁর দুই চোয়াল মধ্যের অঙ্গের এবং দুই পায়ের মাঝের অঙ্গের হেফাজত করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
(মুস্তাদরাকে হাকিম ৪/৩৫৭, সুনানে তিরমিযী ২৪০৯)

কোনো সন্দেহ নেই, যে ব্যক্তি এই দুই অঙ্গের হেফাজত করবে তার ও তার পরিপাশের্বর মানুষজনের জীবন হবে অত্যন্ত নির্মল, পবিত্র ও শান্তিময়।

হাদীসের দ্বিতীয় বাক্যটি আরো অসাধারণ এবং অনেক বেশি আশ্বাসময়। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার বলছেন, احفظ الله ‘তুমি আল্লাহকে হেফাজত করো’। এবার প্রতিদান বলছেন, تجده تجاهك ‘আল্লাহকে তুমি তোমার বরাবর পাবে’। অর্থাৎ আল্লাহ তোমাকে সর্বাবস্থায় তাঁর সাহায্য ও সুরক্ষা দিয়ে তোমাকে ঘিরে রাখবেন। তোমাকে সবরকমের অযাচিত-অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় থেকে আল্লাহ নিরাপদ রাখবেন। তোমার সকল উদ্যোগ-প্রচেষ্টায় আল্লাহ তোমাকে সফল করবেন।

হাদীসের অন্যান্য অংশগুলো প্রসঙ্গে আল্লাহ চাহে তো অন্য কোনো অবসরে আলোচনার ইচ্ছা রাখি। এখানে আমার সকল ভাইদের নিকট আবেদন, আমরা জীবনের সকল অঙ্গনে আল্লাহর বিধানকে আপন করে নিয়ে আল্লাহর সুমহান হেফাজতে প্রবেশ করি। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখক: মুহতামিম, জামিয়া দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া, শায়খুল হাদিস : জামিয়া ইউনুছিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সহ সভাপতি : বেফাক