ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই–তাহলে করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে পারস্পরিক দুরত্ব বজায় রাখতে হবে কেন?

ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে বর্তমান সময়ে একটি বিভ্রান্তি ও তার জবাব

——————————————————————-
মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী
——————————————————————-

.
৥ প্রশ্ন :– ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই অর্থাৎ একজন রোগীর শরীর থেকে তার সংস্পর্শের দ্বারা সেই রোগ অন্যজনের শরীরে যায় না–এটা হাদীসের কথা। তাহলে বর্তমানে করোনা ভাইরাসের ভয়ে নামাযের সময় কেন ফাঁক ফাঁক হয়ে দাঁড়াতে বলা হচ্ছে এবং চলাফেরায় কী কারণে দু’জনের মাঝে অন্তত এক মিটার দুরত্ব বজায় রাখতে বলা হচ্ছে?
.

৥ উত্তর :– হ্যাঁ, মহান আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো মধ্যে কোন রোগ সৃষ্টি হতে পারে না। তাই এমন কোন কথা নেই যে, কেউ কোন রোগীর সংস্পর্শে গেলে তার থেকে সেই রোগ তার মধ্যে যাবে।

তথাপি করোনা ভাইরাসের বর্তমান সময়ে পারস্পরিক দুরত্ব বজায় রাখতে বলা হচ্ছে এ জন্য যে, কোন রোগীর সংস্পর্শে গেলে তার থেকে অন্যজনের মধ্যে সেই রোগ চলে যায় না সত্য, কিন্তু তার সংস্পর্শের কারণে সেই রোগের জীবানু মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তির মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে। এটা মহান আল্লাহর সৃষ্টিগত সে ধরনের রোগের একটি তাছীর।

কিন্তু কারো মধ্যে কোন রোগের জীবানু সৃষ্টি হওয়া মানেই তার সেই রোগ হওয়া নয়। কেননা, চিকিৎসা-বিজ্ঞানের মতে, একটি জীবাণুকে কারো মধ্যে রোগ তৈরীর জন্য তার টক্সিন উৎপাদন ক্ষমতা, দেহকলার অভ্যন্তরে প্রবেশ, উপনিবেশ (কলোনী) তৈরি এবং পোষক ব্যক্তির শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা দমন (immunosuppress) ইত্যাদি বিষয়গুলো অতিক্রম করে যেতে হয়। এমতাবস্থায় কোন রোগের জীবানু কারো শরীরে সৃষ্টি হওয়ার পর তার শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার দ্বারা যদি সেটা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সেই জীবানু তার শরীরে কোন রোগ তৈরী করতে পারে না। আর যদি তার শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকার কারণে জীবানুর কাছে হেরে যায়, তখন জীবানু তার শরীরে টক্সিন উৎপাদন করে দেহকলার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং তার মধ্যে উপনিবেশ তৈরি করার মাধ্যমে তাকে সেই রোগে আক্রান্ত করে।

(বিস্তারিত দেখুন : https://www.wikiwand.com/bn/রোগ_সংক্রামক_জীবাণু )

বস্তুত এমতাবস্থায় সেই জীবানু মহান আল্লাহর ফয়সালা অনুযায়ী কাজ করে। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা সেই ব্যক্তিকে রোগ দেয়ার ইচ্ছা করলে তখন সেই জীবানু তার মধ্যে টক্সিন উৎপাদন করে তার দেহকলার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে উপনিবেশ তৈরী করে তার মধ্যে সেই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটাতে সক্ষম। আর আল্লাহ তা‘আলা সেই ব্যক্তিকে সেই রোগ দেয়ার ইচ্ছা না করলে, তখন সেই জীবানু তার মধ্যে কোন প্রক্রিয়া চালাতে পারে না। বরং তার শরীরের এন্টি বডির সাথে মুকাবিলা করে হেরে গিয়ে সে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা যায়। তখন আর তার সেই রোগ হয় না।

এ জন্য এ ব্যাপারে আমাদের ঈমানকে অটল রাখতে হবে যে, আল্লাহ তা‘আলার হুকুম ছাড়া কারো কোন রোগ হতে পারে না। এমনকি কোন মহামারি রোগীর সংস্পর্শে গেলেও মহান আল্লাহর হুকুম না থাকলে তার সেই রোগ হবে না। আবার কেউ কোন রোগীর সংস্পর্শে না গেলেও আল্লাহ তা‘আলার হুকুম থাকলে তার সেই রোগ হবেই–সে যেখানেই থাকুক না কেন।

তবুও কোন দুরারোগ্য রোগীর সংস্পর্শে গিয়ে কারো মধ্যে সেই রোগের জীবানু সৃষ্টি হলে সে আল্লাহর পরীক্ষায় মধ্যে পড়ে যায়। তাই এক্ষেত্রে রোখসত (হুকুমের ছাড়-জনিত দিক) অবলম্বন করে দুর্বল বান্দা হিসেবে পরীক্ষার স্থল থেকে নিজেকে দূরে রাখার জন্য কোন রোগীর সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে বলা হয়। সেই হিসেবেই করোনার ভয়ে পারস্পরিক দুরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়ে থাকে। যেমন, সর্দি লাগার আশংকায় বেশী ঠাণ্ডা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়। অথচ কারো সর্দি লাগা আল্লাহর হুকুম ছাড়া হতে পারে না।

আর রুখসত হিসেবে দুর্বল বান্দাদের এরূপ পরীক্ষায় পড়া থেকে দূরে থাকা বা সাবধানতা অবলম্বন করাও আল্লাহরই নির্দেশনা–যা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু যারা ঈমানের সুউচ্চ মকামে অধিষ্ঠিত, তারা ‘আযীমত (হুকুমের সর্বোচ্চ দিক)-এর উপর আমল করেন। এ জন্যই এরূপ ব্যক্তিগণের কুষ্ঠরোগীর সাথে বসে খাবার খাওয়ার কথাও হাদীসে রয়েছে।

সার কথা, কেউ কোন রোগীর সংস্পর্শে গেলে তার থেকে সেই রোগ তার মধ্যে যায় না। তবে আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টিগতভাবে কোন কোন রোগের এমন তাছির দিয়েছেন যে, সেরূপ রোগীর সংস্পর্শে কেউ গেলে তার মধ্যে সেই রোগের জীবানু সৃষ্টি হয়। অবশ্য তার দ্বারা রোগ হওয়া বা না হওয়া আল্লাহ তা‘আলার ফয়সালার উপর নির্ভর করে। আল্লাহ তা‘আলা তাকে সেই রোগ দেয়ার ইচ্ছা করলে সেই জীবানু দ্বারা উল্লিখিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার মধ্যে সেই রোগ পয়দা হয়। আর আল্লাহ তা‘আলা তাকে সেই রোগ দেয়ার ইচ্ছা না করলে সেই জীবানু উল্লিখিত প্রক্রিয়ার পথে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে মারা যায়; যার ফলে তার মধ্যে সেই রোগ হয় না। এভাবে হাদীসের কথা যথার্থভাবেই বাস্তবরূপে প্রতিফলিত হয়।

Tagged ,

Leave a Reply

Your email address will not be published.