এপ্রিল ফুল বনাম স্পেনের ঘটনা : সাম্প্রতিক বিতর্ক ও বিভ্রান্তির নিরসন (২য় পর্ব)

এপ্রিল ফুল বনাম স্পেনের ঘটনা :

সাম্প্রতিক বিতর্ক ও বিভ্রান্তির নিরসন

(২য় পর্ব)

————————————-
মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী
————————————-

.
.
এপ্রিল ফুলের উৎস সম্পর্কে আমাদের দেশে একটি ঘটনা সমধিক প্রচারিত। তা হলো–স্পেনের গ্রানাডায় খৃস্টানরা মুসলমানদেরকে বোকা বানিয়ে তাদের উপর নির্মম হত্যাকাণ্ড চালায়। সেদিনটি ছিলো ১লা এপ্রিল। সেই থেকে খৃস্টানরা প্রতি বছর এ তারিখে একে অপরকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে মজা করে ‘এপ্রিল ফুল’ পালন করে। আসুন, এ ব্যাপারে পর্যালোচনা করি।

পূর্বেই বলা হয়েছে–মানুষকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানোর ব্যাপারটি এমনিতেই গুনাহর কাজ। তাই এ প্রথা নাজায়িয হওয়ার জন্য এর উৎস কী বা সেই উৎসের সাথে এর সম্পর্কের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু–সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। কিংবা এর উৎস সম্পর্কে কেউ না জানলেও কিছু যায় আসে না–সর্বাবস্থায়ই এটা পালন করা নাজায়িয ও হারাম হবে।

অপরদিকে পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এর উৎস হিসেবে যা কিছু বর্ণনা করা হয়, এসবই লোকমুখে শ্রুত কথা কিংবা অনুমাননির্ভর বর্ণনা–যাকে নিশ্চিতভাবে এর কারণরূপে নির্ণয় করা যায় না। আবার এ প্রথা পালন নাজায়িয হওয়ার ক্ষেত্রে সেই উৎসের ব্যাপারটি গৌণ বিধায় এপ্রিল ফুলের উৎসনির্ণয়ে প্রচলিত সেসব ঘটনার কোনটা সত্য বা কোনটা মিথ্যা এ নিয়ে তেমন মাথা ঘামানো হয় না। বরং যে যার জানা মতো এ বিষয়টি বলে থাকেন।

কিন্তু অধুনা অনেককে দেখা যাচ্ছে–এপ্রিল ফুলের উৎস হিসেবে বহুল প্রচারিত স্পেনের ঘটনাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন এবং এ ব্যাপারে গোলকধাঁধায় পড়ে প্রমাণসিদ্ধ নাজায়িয এপ্রিল ফুল পালনকে বৈধতা দেয়ারও প্রয়াস পাচ্ছেন। নাউযুবিল্লাহ। তাই তো দেখা যায়, তারা ১লা এপ্রিল এলেই স্পেনের ঘটনাকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য উঠে পড়ে লাগেন, কিন্তু মুসলমানগণ যেন এপ্রিল ফুল পালন না করেন–সে ব্যাপারে কিছুই বলেন না। অধিকন্তু তাদের কেউ আবার স্পেনের ঘটনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে “এপ্রিল ফুল এবং মুসলিমদের পুড়ে মারার ভ্রান্ত গল্প” শিরোনাম দিয়ে ওয়েব-ব্লগে প্রবন্ধ লিখেছেন, এরপর নীচে লিখে দিয়েছেন–“হ্যাপি এপ্রিল ফুল ডে”।

আসতাগফিরুল্লাহ। দেখুন, তার প্রমাণ ওয়েব সাইটের নিম্নোক্ত ব্লগ-লিঙ্কে– http://www.sachalayatan.com/niazmc/43954

এটা কি সত্যের (?) উদঘাটন নাকি বিপথগামিতা–তা পাঠক-পাঠিকাগণই বিচার করবেন। এতে প্রশ্ন জাগে, তাদের এ তৎপরতার উদ্দেশ্য কী এবং উম্মতকে এভাবে ভিন্ন পথে নিয়ে যাওয়ার পিছনে কী রহস্য লুকায়িত?

এপ্রিল ফুলের সাথে স্পেনের ঘটনার সম্পর্ককে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য এ ভাইয়েরা অনেক কসরত করেছেন। পক্ষান্তরে এপ্রিল ফুলের উৎসের ব্যাপারে প্রচলিত অন্যান্য ঘটনাসমূহের কোনটিকে এভাবে মিথ্যা প্রমাণ করার কোনরূপ চেষ্টা করেননি। তাতে প্রশ্ন জাগে–কেন তাদের শুধুই স্পেনের ঘটনা নিয়ে মাথা ব্যথা হলো এবং এপ্রিল ফুলের ওরিজিন বর্ণনায় অন্যকোন ঘটনা নিয়ে কেন মাথা ব্যথা হলো না? অথচ পরিষ্কার কথা যে, এপ্রিল ফুলের উৎস সম্পর্কে যেসব ঘটনা প্রচলিত আছে, সবই অনুমাননির্ভর বা ধারণামূলক। তাই এসব ঘটনার কোনটিকেই নিশ্চিতভাবে এপ্রিল ফুলের উৎস বলা যায় না। এমতাবস্থায় এত কষ্ট করে এপ্রিল ফুলের সাথে স্পেনের ঘটনার যোগসূত্রতাকে মিথ্যা প্রমাণ করার প্রয়োজনই পড়ে না। বরং এ ব্যাপারে অন্যসব ঘটনাকে যেমন ধারণাভিত্তিক ব্যবহার করা হয় এবং কেউ সেগুলোকে মিথ্যা প্রমাণ করতে যায় না, এক্ষেত্রেও অবস্থা তেমনি হওয়ার কথা।

তদুপরি তারা তাদের দাবীর সপক্ষে যে যুক্তি-প্রমাণ পেশ করেছেন–সেগুলো অকাট্য নয়। বরং তাদের সেই যুক্তি-প্রমাণ খণ্ডন করার মতো সেখানে ভিন্ন যুক্তি-প্রমাণও আছে–যার দ্বারা স্পেনের ঘটনার সাথে এপ্রিল ফুলের যোগসূত্রতার ধারণাই প্রবল হয় এবং তাদের দাবী ভুল প্রতিপন্ন হয়। তাই তাদের এ প্রয়াস মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা ছাড়া আর কী নতীজা বয়ে আনতে পারে?

তাদের সেই বিভ্রান্তির নিরসনে এর বিস্তারিত প্রমাণভিত্তিক তথ্য-বিবরণ তুলে ধরার আশা করছি। যাতে এ ব্যাপারে তাদের দুরভিসন্ধি সরলমনা মানুষকে বিপথগামী না করতে পারে।

এপ্রিল ফুলের সাথে স্পেনের ঘটনার সম্পর্ককে অস্বীকারকারীগণ তাদের দাবীর সপক্ষে যে যুক্তি-প্রমাণ পেশ করেছেন–সেগুলো অকাট্য নয়। বরং তাদের সেই যুক্তি-প্রমাণ খণ্ডন করার মতো সেখানে ভিন্ন যুক্তি-প্রমাণও আছে–যার দ্বারা স্পেনের ঘটনার সাথে এপ্রিল ফুলের যোগসূত্রতার ধারণাই প্রবল হয় এবং তাদের দাবী ভুল প্রতিপন্ন হয়।

নিম্নে এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য পয়েন্টগুলো তুলে ধরছি–
.
॥ ক ॥

তারা তাদের দাবীর সপক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই পেশ করেছেন যে, খৃস্টানরা স্পেনের গ্রানাডার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন ১৪৯২ সালের ২রা জানুয়ারী। তা ১লা এপ্রিলে হয়নি। তাই এর সাথে এপ্রিল ফুলের সম্পর্ক হতে পারে না।

তাদের এ বিভ্রান্তির জবাব হলো :–

তাদের জানা থাকার কথা যে, খৃস্টানরা গ্রানাডায় ১৪৯২ সনের ২রা জানুয়ারী অকস্মাৎ প্রবেশ করেনি, বরং তারা এর কয়েকমাস আগেই গ্রানাডার সীমানায় প্রবেশ করেছে এবং একের পর এক এলাকা দখল করে দীর্ঘদিন যাবত তারা গ্রানাডার মূল শহরকে অবরোধ করে রেখেছিলো। গ্রানাডা অঞ্চলে তাদের সেই প্রবেশের সময় তাদের প্রবেশকে নিষ্কণ্টক করতে মুসলমানদের উপর ভয়াবহ হিংস্র আক্রমণ চালিয়ে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে এবং তাদের ঘরবাড়ী ও সহায়-সম্পদে আগুন লাগিয়ে সেগুলোকে জ্বালিয়ে দিয়েছে। গ্রানাডায় তাদের এ অভিযান শুরু হয়েছিলো ১৪৯১ সনের ১লা এপ্রিলে। সুতরাং গ্রানাডা বা স্পেনের ঘটনার সাথে এভাবেই এপ্রিল ফুলের যোগসূত্র স্থাপিত হয়।

এ বিষয়টি ইতিহাসবিদ Oliver Otis Howard-এর লিখিত “Isabella of Castile” বিষয়ক ঐতিহাসিক ডকুমেন্টে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এ সম্পর্কে তার বর্ণনা হলো–
In April 1491, the grand army of Spain, of [267] between 50,000 and 60,000, embracing quotas from all the provinces, and having in it well-drilled Swiss mercenaries, was in better shape for a campaign then ever before. Thanks to Isabella. It was well equipped and well supplied
.
তার সেই ইতিহাসের বিবরণ “FALL OF GRANADA—END OF THE WAR” শিরোনামে নিম্নোক্ত ওয়েবলিঙ্কে পাবেন–
http://www.mainlesson.com/display.php? author=howard&book=isabella&story=fall

তেমনিভাবে ১৪৯২ সনের ২রা জানুয়ারী গ্রানাডার ক্ষমতা দখল করার পর খৃস্টানরা স্পেনের মুসলমানদের উপর সীমাহীন নির্যাতন ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের অবতারণা করেছে। তারা স্পেনকে মুসলিমশূন্য করার দুরভিসন্ধি নিয়ে নানারকম পলিসি গ্রহণ করে। তার অংশ হিসেবে মুসলমানদের প্রতি এ হুকুম জারী করে–হয়তো ক্যাথলিক খৃস্টান হও, নয়তো এদেশ ছেড়ে চলে যাও। তা না হলে নির্মম হত্যার সম্মূখীন হতে হবে।

তখন খৃস্টানদের অবর্ণনীয় নির্যাতন ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করার কারণে বহু মুসলমান উত্তর আফ্রিকা ও অন্যান্য দেশে চলে যান। আবার অনেকে প্রাণ বাঁচাতে বাহ্যত খৃস্টানধর্ম গ্রহণ করেন–যদিও অন্তর থেকে খৃস্টান হন নি।

এদের ছাড়া আরো যে মুসলমানরা সে দেশের মায়া ছাড়তে না পেরে সেখানেই থেকে যান, তাদের উপর খৃস্টানরা ভয়ঙ্কর গণহত্যা চালায়। তাদেরকে যেখানেই পেতো, সেখানেই নির্মমভাবে হত্যা করতো।

সে সময় গণহত্যা থেকে বাঁচার জন্য মুসলমানরা দিশেহারা হয়ে যান। এমতাবস্থায় খৃস্টানরা জাহাজে করে তাদের উত্তর আফ্রিকায় চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তাদেরকে খতম করার ফন্দি আঁটে। সে মতে তাদের জাহাজ যখন মাঝ দরিয়ায় পৌঁছে, তখন সেই জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে মুসলমানদেরকে পানিতে ডুবিয়ে মারে। সেদিনটি ছিলো ১৫০১ খৃস্টাব্দের ১লা এপ্রিল।

এভাবে খৃস্টানরা ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে মুসলমানদেরকে মেরে স্পেনকে মুসলিমশূন্য করে এবং সেই আনন্দে ১লা এপ্রিল একে অপরকে বোকা বানানোর এপ্রিল ফুল উৎসব পালন করে। যার মাধ্যমে তারা মুসলমানদের সেই বোকামীকে স্মরণ করে উপহাস করে থাকে।

এ সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ডকুমেন্ট রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে এপ্রিল ফুলের সাথে স্পেনের মুসলমানদেরকে ডুবিয়ে মারার এ ঘটনা বর্ণনা করা হয়। যেমন, পাকিস্তানের আন-নূর চ্যানেল পরিবেশিত ‘এপ্রিল ফুল’ আলোচনায় স্পেনের সেই ইতিহাস-তথ্যকে বর্ণনা করা হয়েছে। তা শুনুন ইউটিউবের নিম্নোক্ত লিঙ্কে–
https://www.youtube.com/watch?v=ZXG7DG8U8nY

তেমনি এপ্রিল ফুল বিষয়ক অডিও-সিন ডকুমেন্টারী April Fool (Islamic History and Consequence in the form of a play)-এর মধ্যে এ সম্পর্কে প্রামাণ্য-আলোচনা রয়েছে। ইউটিউবের নিম্নবর্ণিত লিঙ্ক থেকে তা শুনতে পারেন–
https://www.youtube.com/watch?v=c1G3S_iYU3w

সুতরাং প্রমাণিত হলো–খৃস্টানরা গ্রানাডার ক্ষমতা ১৪৯২ সনের ২ জানুয়ারী গ্রহণ করলেও তার আগে ১৪৯১ সনের ১লা এপ্রিলে মুসলমানদের মধ্যে নির্বিচার গণহত্যার হিংস্রকাণ্ড ঘটিয়েছে। তেমনি গ্রানাডার ক্ষমতা গ্রহণের পর ১৫০১ সনের ১লা এপ্রিল মুসলমানদের উপর গণহত্যা চালিয়েছে। সুতরাং স্পেনের ঘটনায় ১লা এপ্রিল বিদ্যমান রয়েছে। যার সাথে এপ্রিল ফুলের যোগসূত্রতা সূচিত হয়।

.

(পরের অংশ পরবর্তী পোস্টে দেখুন)
.
———————————————

১ম পর্ব না পড়ে থাকলে তা পড়ুন এ লিঙ্কে–

এপ্রিল ফুল বনাম স্পেনের ঘটনা : সাম্প্রতিক বিতর্ক ও বিভ্রান্তির নিরসন (১ম পর্ব)

Tagged

Leave a Reply

Your email address will not be published.